রবিবার ৩ জুলাই, ২০২২ | ১৯ আষাঢ়, ১৪২৯

স্বপ্নে বাঘকে থাপ্পড় রক্তাত্ব বউ

ডা. সাঈদ এনাম | রবিবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৭ | প্রিন্ট  

স্বপ্নে বাঘকে থাপ্পড় রক্তাত্ব বউ

সকালে  চেম্বারে আসার সময় বড় মেয়ে ওয়ার্দা বললো, আব্বু বলোতো টিকটিকি ইংরেজি কি? পড়লাম বেশ ঝামেলায়। এতো পড়াশুনা, এতো বড় বড় ডিগ্রী জীবনে নেওয়া হয়ে গেলো, অর্ধেক জীবন পার করে দিলাম, শত সহস্র রোগী দেখলাম, ভালো করলাম অথচ সেই আমি কিনা টিকটিকির ইংরেজী জানিনা। আহ! মাত্র ক্লাস টুতে পড়ুয়া একটা মেয়ে তাও কিনা আমার ঘরের, দিলোতো মহা বিপদে ফেলে। তাও মন কে শান্তনা দিতে পারতাম, যদি জিজ্ঞেস করতো আব্বু তেলাপোকার ইংরেজি কি, তাহলে হয়তো এই ভাইভায় অনার্স মার্ক পেয়ে পাশ করতাম কারন এইচ এস এস সি তে থাকতে তেলাপোকা নামক গৃহপালিত এ প্রানীর বংশ পরিচয়, আদি ভাই বেরাদার,দেহের গঠন সব কিছুই মুখস্থ করতে হতো বায়লোজী নামের বিষয় টি পড়তে যেয়ে।

শুধু কিতাই, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় আরশোলা বা তেলপুকা নামক ছোট এ প্রানীর গঠন থেকে আমাদের সে সময় দুই কি তিন মার্কের একটা প্রশ্ন থাকতোই। দুই কি তিন মার্ক তখন অনেক। কারন তখন দশমিক এক মার্ক কম হলে কেউ ডি এম সি তে কেনো হয়তো মেডিকেলেই চান্স পেতোনা। তার আজীবন লালিত সকল স্বপ্ন এক নিমষেই ধুলিসাৎ হয়ে যেতো। কারন তখন সরকারি মেডিকেল কলেজ ছিলো খুবই কম হাতে গুনা কয়েকটি আর প্রাইভেট মেডিকেল ছিলো মাত্র একটি। প্রচন্ড প্রতিযোগিতা। ভালো রেজাল্ট আর ভর্তিকালীন সময়ে প্রচুর পড়াশুনা ছাড়া কেউই মেডিকেলে চান্স পেতো না। তবে কোটা ক্ষেত্রে ছিলো ব্যতিক্রম। কোটার আসনে অতো ভালো রেজাল্ট বা এতো কমপিটিশন থাকতোনা।


যাক মেডিকেল ভর্তি যুদ্ধে সেজন্যে আরশোলা সাহেবের গঠন, চলন ইত্যাদি বিশদ বিবরন এর সাথে আমাদের মেডিকেল ভর্তিচ্ছুক দের কম বেশ সবাই পরিচিত ছিলো। আহা সত্যি কি কস্টের সেই দিনগুলো।

কোচিং এর সময় এক বড় ভাই প্রথম দিন ক্লাসে বলেছিলো, ঢাকা মেডিকেলে চান্স পেতে হলে দৈনিক ১৪ ঘন্টা করে পড়তে হবে আর সব গুলো বইয়ের সকল লেখকের টেক্সট বুক সংগ্রহ করে লাইন বাই লাইন মুখস্থ করতে হবে তারপর কপালে জুটবে ঢাকা মেডিকেল। তার পর থেকে শুরু হতো নীলক্ষেত থেকে টেক্সট বই কালেকশন।


আহা সেই গাজী আজমল স্যারের প্রানী বিদ্যা, ইসহাক নুরুন্নবী স্যারের পদার্থ বিদ্যা, নাগ নাথ কাশেম স্যারের কেমেস্ট্রি টেক্সট বুক…
সব গুলোর লাইন বাই লাইন মুখস্থ করতে হয়েছে আমাদের একেবারে কোরানে হাফেজের মতো করে। তারপরেই না চান্স হয় ঢাকা মেডিকেলে। সব কস্টের অবসান ঘঠে সুন্দর এক সোনালী সুর্যোদয়ের মাধ্যমে।

যাইহোক, আমি বললাম, মা’মনি কাল থেকে আমি স্কুল ব্যাগ নিয়ে তোমার কেজি স্কুলে ভর্তি হবো, আবার পিটি করবো, বাম ডান বাম, ডানে ঘুরো, বামে ঘুরো, জাতীয় সংগীত গাবো, তোমাদের সাথে বসবো, শুরু করবো পড়াশুনা, ইত্যাদি ইত্যাদি। আর প্রথমেই শুরু হবে আমার পড়াশুনা, টিকটিকির ইংরেজি দিয়ে। ওকে মামনী..?


মা’মনি আমার হেসেই কুটিকুটি। লাগবেনা আব্বু, আমিই বলে দিচ্ছি। টিকটিকির ইংরেজি লেজার্ট। লি..জার্ট। মনে থাকবে’তো?
জ্বী মামনী মনে থাকবে,আর ভুল হবেনা।, হেসে হেসে বললাম।

তারপর বিদায় নিয়ে আসলাম চেম্বারে। রাস্তায় গাড়িতে বসে বসে ভাবতে লাগলাম, ক্লাস টুতে পড়ুয়া এই মেয়েটার টিকটিকি ইংরেজি কি, তা কেনো জানতে হলো।
আমরাতো এতোদুর আসলাম, আমার কোথাও তো কোন দিন টিকটিকির ইংরেজির প্রয়োজন হয়নি। ওর কেনো প্রয়োজন হচ্ছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা তাহলে কোন দিকে যাচ্ছে, বুঝতে পারলাম না।

যদি বুঝতাম ও ইংলিশ মীডিয়ামে পড়ছে তাহলে বুঝতাম এক ব্যপার। সেখানে মামুলী ক’টা সাবজেক্ট পড়ানো হয়,জাস্ট বিদেশ যাবার উপযোগী করার জন্যে। তাই ইংরাজি মিডিয়ামে পড়ে দেশের সনাম ধন্য পাব্লিক ভার্সিটি গুলো ভর্তি হওয়া খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। কম্পিটিশন এ দূরে ছিটকে পড়ে যায় বাংলা মিডিয়াম বা বাংলা মিডিয়ামের ইংলিশ ভার্সন ছাত্রছাত্রী দের কাছে। তাই আমি বলি আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আমাদের ছেলেমেয়েদের ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ানোটা আমার দৃষ্টি তে ছেলে মেয়েদেরকে এক ধরনের বিপদে ফেলার মতো।

যাই হোক, মেয়েটার কথায় সেই যে সকালে মনে মনে হাসা শুরু হয়েছিলো, সেটার রেশ কাটতে না কাটতেই চেম্বারে এক রোগীর সাথে কথা বলতে আবার একরাশ হাসির পাল্লায় পড়লাম।
রোগী নিয়ে আবার কিসের হাসি। রোগি নিয়ে কি হাসা যায়। তাইতো..?

তাহলে একটু খুলেই বলি।

আজকের রোগীকে কেঊ পাঠায় নি। তিনি নিজেই এসেছেন। কথা বার্তা পোশাক আশাকে বুঝাই যাচ্ছিলো তিনি গ্রামের লোক।এসেছেন গ্রাম থেকে। লোকটির চেহারায় অদ্ভুত এক সরলতা খেলা করছিলো।

আমিই শুরু করলাম, কি ব্যাপার..কি সমস্যা হয়।
স্যার তেমন কিছু না। আমার ঘুমের অসুবিধা।

কিরকম?

রাতে ঘুম আসেনা, আসেলেও খুব দেরীতে। আজ প্রায় এক বছর এ সমস্যার।

হুম দেরীতে তো ঘুম অনেকেরই আসে। এটা বেশীর ভাগই হয় অভ্যাসের কারনে। যেমন রাতে চা খাওয়া। মোবাইল দেখা, নেটে থাকা।

স্যার আমার সমস্যা তো অন্য জায়গায়।

তা কোন জায়গায়?

স্যার ঘুম আসলেই আমি কেবল স্বপ্নে দেখি বাঘ, বড় বড় বাঘ। মাঝে মাঝে সিংহ ও দেখি।

হুম। ভালো। এটাতো সবাই টুকটাক দেখে থাকে। এতে বিচলিত হবার কিছু নেই।

স্যার, আমার স্বপ্ন আলাদা। ভয়ংকর।

যেমন?

স্যার আমি প্রায় ই স্বপ্নে দেখি বাঘ আমার মুখে কাছে আসছে, হা করছে আমাকে খেতে আর আমি জোরে কষে দেই একটা থাপ্পড়…,এ বলে সে থেমে গেলো।

থামলেন যে, তারপর…কি হয় বলুন ?

স্যার তারপর কি বলবো, এটাইতো সমস্যা। আমি স্বপ্নে কষে থাপ্পর মারি বাঘ কে। কিন্তু চিৎকার দিয়ে উঠেন আমার স্ত্রী। আমি বাঘ কে মারিনি। মেরেছি আমার বউ কে। সেও তখন ঘুম থেকে উঠে সেকি চিল্লা পাল্লা, কান্নাকাটি। তারপর….।

তারপর কি? আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

তারপর আমি বউয়ের মাথা ছুয়ে কিরাকাটি, বউ খোদার কসম। আমি স্বপ্নে দেখছি বাঘ মারতেছি, বাঘ আমারে গিলা খাইতাছে..।
বউ বিশ্বাস করেনা। আমি তার হাতে পায়ে ধইরা কই, বউ এইবারের মতো আমারে মাপ কইরা দাও। আর অইবো না। আর আমি বাঘ রে মারুম না, স্বপ্নে। এমন কি সত্যি আসলেও মারুম না।

আমার বউ খুব বালা, সে আমারে খুব ভালোবাসে। ভালো না বাসলে এদ্দিনে সে চইলা যাইতো। কারন স্যার আমিতো এরকম বাঘ ক’দিন পরপর ই মারি…।

মানে ক’দিন পরপর ই আপনি আপনার বউরে ঘুমের ঘোরে মারতেছেন? আশর্চয্য…!!

জ্বি স্যার। এজন্যই তো আসছি আপনার কাছে। আমার বউ এখন আর আমার কাছে শুয় না স্যার। সে দিন স্বপ্নে বাঘরে এমন জোরে থাপ্পড় দিছি, বউয়ের নাকে গিয়ে পড়ছে হাত। এমনি ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে। কি যে কান্ড অইছে সেই রাতে। তার পর থাইকা সে আমার কাছে আর শুয় না। আমার মা’ই তারে কইছে, এই বাদাম্যা র লগে আর শুইয়ো বৌমা। ওরে মনে হয় জ্বীনে ধরছে। কি কমু স্যার। এখন সে আর আমার সাথে শুয় না আর তারে ছাড়া আমারো ঘুম ও আসেনা। কি যে মুশকিলে পড়ছি স্যার।

আমার একটু হাসি পাচ্ছিলো। কি সহজ সরল লোক আর তার বাচন ভঙ্গি। বললাম, আপিনার স্ত্রী কি আসছেন সাথে?

জ্বী স্যার আসছেন। ডাকুম?

হ্যা।আসতে বলেন। আমি উনার সাথে একটু আলাপ করে নেই আগে। ওকে?

সে তার বউকে ডেকে আনলো। বড় করে গোমটা টানানো। গ্রামের সহজ সেরল বধুরা যেমন টানে ওরকম আরকি।

আমি জিজ্ঞেস করলাম,

আপনার স্বামীর বাঘ মারার ব্যাপারটা বলুনতো। সত্যি..?

জ্বী স্যার হাছা। উনি প্রায়ই ঘুমের মধ্যেই নাকি স্বপ্নে দেখেন উনারে বাঘ তাড়াইতেছে। তার পর এক সময় বাঘ উনারে ধইরা ফালায়। কিন্তু উনারে খাইতে পারেনা। উনি বাঘের সাথে যুদ্ধ করেন। এক সময় এমন জোরে থাপ্পর দেন,ঐ এক থাপ্পরেই বাঘ শেষ। এই একি স্বপ্ন প্রত্যেক রাইত দেখেন। আর আদতে কি উনি বাঘের লগে কুস্তিগিরি করেন আর থাপ্পর মাইরা বাঘ মারেন। হেইডা উনারে জিগাইয়েন। আমরা আর পারিনা স্যার। মাঝে মধ্যে তিনি আবার ফুটুবল খেলেন, গোল মারেন, তাও সব ঘুমের মাঝে। গোল যে কোথায় মারেন কি কমু স্যার। আমি শেষ।

একদিন গভীর রাইত হঠাৎ কইরা দিড়িম কইরা এক আওয়াজ অইলো। আমি ঘুম থাইক্যা উইঠা দেহি কি উনি বিছানা নাই। বিছানা থাইকা পইড়া গড়ায়া গড়ায়া এক্কেরে তলে গেছেগা।
আমি কইলাম, কি অইছে, বাঘে দাবড়ানি দিছেনি আবার।
তিনি কন, না। তিনি নাকি ক্রিকেট খেলতেছিলেন। ক্যাচ না কি উটছিলো। উইটা ধরতে গিয়ে মাঠের বাইরে পইড়া গেছেনগা। স্বপ্নের ক্রিকেট খেলায় সাকিব না কোন ছ্যমরা নাকি বল উঠাইয়া একটা ছক্কা মারছিলো। উইটা লইতে গিয়ে…. জিগান জিগান উনারে…।

কি কমু, আমরা স্যার উনারে লইয়া ছিন্তায় আছি। আম্মা কইছে, বাদাইম্যা রে আলগ কইরা দেও বউ মা। হে তার একলা একলা বাঘ মারুক, বল খেলুক আর ছাকিব না কোন ছ্যামরার কেছ ধরুক। আমরা আর তার লগে শুমু না।

কিন্তু করুম কি স্যার, বড় মায়া হয়। উনি মানুষ টা বড়ো বালা। সিদাসাদা, তয় বোকা কিছিমের। খুব পরিশ্রমে। জীবনে একটা জিনিষ ই জানেন, তা অইলো কাম করা। কাম আর কাম। পরান ডারে পানি কইরা দিতাছইন পরিবারের সবার সুখের লাইগা, কাম কইরা।

কিন্তু গত কয় মাস ধইরা যে কি অইলো। ঘুমাইলেই খালি স্বপ্ন দেখেন। বাঘ মারনের স্বপ্ন। অনেক তাবিজ টাবিজ, পানি পড়া দিলাম আমরা, কিন্তু কিছুই অয় না।

পরে গেরামের এক ডাক্তার কাছে গেলাম, হে কইলো, মনে হয় বেরেইনে ধরছে। তাই স্যার আইলাম।
আমরা আর পারিনা, এই বাঘ মারা, সিংহ মারা, ফুটবল খেলা আর সাকিব না কোন চ্যামরার ক্যাছ ধরা। স্যার সবতো যায় আমার উপর দিয়া। মহিলার গলায় একটু ঝাঁজ। ভালোবাসার ঝাঁজ।
এর পর তিনি সুর টা একটু নরম করলেন। বললেন, স্যার এগুলান কি বালা অইবো।

হ্যা, এগুলো খুব একটা বড় সমস্যা না। ভালো হবে। আচ্ছা তুমি একটু বাইরে বস। আমি তোমার স্বামীর সাথে একা আরো কিছু কথা বলে নেই। তোমাকে আবার ডাকবো পরে।
……..(চলবে)

ডা. সাঈদ এনাম
এমবিবিএস(ডিএমসি,কে-৫২)
এম ফিল (সাইকিয়াট্রি)
সাইকিয়াট্রিস্ট এন্ড ইউ এইচ এফ পি ও
সিলেট।

Facebook Comments Box

Comments

comments

advertisement

Posted ১:২৪ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৭

সংবাদমেইল |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. মানজুরুল হক

নির্বাহী সম্পাদক: মো. নাজমুল ইসলাম

বার্তা সম্পাদক : শরিফ আহমেদ

কার্যালয়
উপজেলা রোড, কুলাউড়া, মেলভীবাজার।
মোবাইল: ০১৭১৩৮০৫৭১৯
ই-মেইল: sangbadmail2021@gmail.com

sangbadmail@2016 কপিরাইটের সকল স্বত্ব সংরক্ষিত