বুধবার ২৭ অক্টোবর, ২০২১ | ১১ কার্তিক, ১৪২৮

প্রবাসে নারী শ্রমিকের সুরক্ষার দায়িত্ব নিন

রাজেকুজ্জামান রতন | শনিবার, ০২ অক্টোবর ২০২১ | প্রিন্ট  

প্রবাসে নারী শ্রমিকের সুরক্ষার দায়িত্ব নিন

করোনাকালে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পূর্ণ করা আর যাবৎকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অবদান প্রবাসী শ্রমিকদের। গত অর্থ বছরে প্রবাসীরা প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন দেশে। পৃথিবীর যে তিনটি দেশ রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে করোনাকালে এগিয়ে ছিল তাদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাকি দুটো দেশ হলো মেক্সিকো ও পাকিস্তান। আর রেমিট্যান্স অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর অষ্টম বৃহত্তম দেশ। এ ক্ষেত্রে পুরুষ শ্রমিকদের পাশাপাশি নারী শ্রমিকরাও এগিয়ে এসেছেন। পৃথিবীর প্রায় ১৬৯টি দেশে শ্রম বিক্রি করছেন ১ কোটি ২৩ লাখের বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি, যাদের মধ্যে নারীর সংখ্যা এখন ১০ লাখের বেশি। এক জরিপে দেখা গিয়েছিল দেশে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। কারণ তারা তাদের আয়ের প্রায় পুরোটাই পাঠিয়ে দেন দেশে।

এক হিসাবে দেখা যায় বিদেশ যেতে যে পরিমাণ টাকা খরচ হয়, তা গড়ে পাঁচ মাসের মধ্যে নারী কর্মীরা দেশে পাঠিয়ে দিতে পারেন। সাধারণত দেখা যায়, পুরুষ শ্রমিকরা তাদের আয়ের ৭০-৮০ শতাংশ দেশে পাঠান। কারণ তারা নিজেরা নানা ধরনের কাজে কিছু টাকা খরচ করে থাকেন। আর নারী কর্মীরা পাঠান তাদের আয়ের প্রায় পুরোটাই। যদিও পুরুষ শ্রমিকদের আয় বেশি। আর নারীদের বেশির ভাগ গৃহকর্মী হওয়ায় তাদের আয় কম। নারী শ্রমিকরা দেশে তার পরিবার পরিজন, বাবা-মা, স্বামী-সন্তানদের কথা ভেবে দাঁতে দাঁত চেপে যেমন কষ্ট সহ্য করেন, তেমনি আয়ের পুরোটাই দেশে পাঠিয়ে দেন। অন্যদিকে, দেশে ফিরে আসা নারী শ্রমিকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায় বিদেশে ৩৫ শতাংশ নারীই বিভিন্নভাবে নিপীড়নের শিকার হয়ে থাকেন। এই পরিশ্রমী, কষ্টসহিষ্ণু নারীদের পাঠানো টাকা দেশে এলেও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের যথাযোগ্য সম্মান ও সুরক্ষার ব্যবস্থা কি করা হয়েছে, নাকি যতটুকু তাদের প্রাপ্য ততটা কি তারা পাচ্ছে?

২০১৯ সালে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদনে নারী নিপীড়নের বিষয়টি উঠে এসেছে। সৌদি আরব থেকে ফেরত ১১০ নারী গৃহকর্মীর সঙ্গে কথা বলে কমিটি ২০১৯ সালের ২৬ আগস্ট একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। তাতে বলা হয়, ৩৫ শতাংশ নারী শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন এবং ৪৪ শতাংশ নারীকে নিয়মিত বেতন দেওয়া হতো না। দেশে ফিরে আসা নারী শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে মন্ত্রণালয় তাদের ফিরে আসার ১১টি কারণ চিহ্নিত করেছিল। মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বিদেশফেরত নারী কর্মীদের মধ্যে ৩৮ জন শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, ৪৮ জন নিয়মিত বেতন-ভাতা পেতেন না। এ ছাড়া অন্তত ২৩ জনকে পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হতো না। সেখানে তারা নিয়োগকর্তা এবং মকতবের (সৌদির রিক্রুটিং এজেন্সি) প্রতিনিধির দ্বারা বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

কিন্তু অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে যে কষ্টের কথা বলতে নারীরা ভয় পান। এক. লোকলজ্জার ভয়, দুই. ক্ষমতাবানদের ভয়। কষ্টের কথা বলতে গিয়ে যদি আরও কোনো বড় ক্ষতি হয়ে যায় এই আশঙ্কায় প্রবাসফেরত নারীরা দেশে এসে তাদের প্রতারণার শিকার হওয়ার কথা আর প্রবাসে পাওয়া কষ্ট ও অপমানের কথা বলতে চান না। তাদের না বলা কথা যেন অশ্রুবিন্দু হয়ে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে। কেউ যেন না দেখে এটা ভেবে দ্রুত মুছে ফেলতে চান সে জলের ধারা আঁচলে বা ওড়নায়। তার পরও আড়াল করা যায় না।

তেমনি কান্নার গমকে ফুঁপিয়ে উঠতে উঠতে কালিয়াকৈরের রত্না বলেন, ‘১ লাখ ৩০ হাজার টাকা দিয়ে সৌদি আরব গিয়েছিলাম। ১১ মাসের মাথায় ফিরে আসতে হয়েছে। ওরা কাজ করায় কিন্তু বেতন দেয় না। কোনো টাকা নিয়ে আসতে পারিনি। যার কাছ থেকে এই টাকা নিয়েছিলাম, তাকে ফেরত দিতে পারিনি। তিনি এখন হুমকি দিচ্ছেন, মামলা করবেন। স্বামীও ছেড়ে চলে গেছেন। চার মেয়েকে নিয়ে অনেক কষ্টে দিন পার করছি।’ করোনা মহামারীর মধ্যে সৌদি আরব থেকে কাজ হারিয়ে দেশে ফেরা রতœা আক্তার ডয়েচে ভেলের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে এভাবেই বলেছেন তার কষ্টের কাহিনী।

এ রকম কাহিনী তো শত শত নারীর। সাম্প্রতিক বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস্) দেশে ফেরা নারী শ্রমিকদের ওপর একটি গবেষণা পরিচালনা করেছে। তাতে করোনাকালে দেশে ফিরে আসা নারীদের বেদনার চিত্র ফুটে উঠেছে। গবেষণা জরিপে দেখা গিয়েছে, বিদেশফেরত ৮৫ ভাগ নারী শ্রমিক হতাশায় ভুগছে। কাজের আশায় মধ্যপ্রাচ্যে গিয়েছিলেন সেখানে কাজ হারিয়ে ফিরে এসেছেন, দেশেও নতুন করে কোনো কাজ জোগাড় করতে পারেনি ৬০ ভাগ শ্রমিক। করোনা মহামারীর বছরে ২০২০ সালে বিদেশ থেকে ফেরত এসেছেন ৪ লাখ ২৫ হাজার ৬৯৭ জন কর্মী। এর মধ্যে ৫০ হাজার ৬১৯ জন নারী। আর তাদের ২২ হাজারই সৌদিফেরত। এসব নারীর বেশির ভাগই তাদের ওপর ঘটে যাওয়া নানা ধরনের শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করেন।

অন্যদিকে বিলস্-এর গবেষণা থেকে জানা যায়, বিদেশে যাওয়া ২৩ শতাংশ নারী শ্রমিক এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই দেশে ফিরেছেন, ১৮ শতাংশ এক বছরের সামান্য বেশি সময় থেকেছেন আর ৫৫ শতাংশ নারী শ্রমিকের দেশে ফেরত আসা ছিল জবরদস্তিমূলক। অর্থাৎ তাদের জোর করে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বিলস্-এর গবেষণায় আরও উঠে এসেছে দেশে ফিরে আসা নারী কর্মীদের দুর্দশার চিত্র। দেখা গেছে, দেশে ফেরত আসা প্রতি তিনজন নারী শ্রমিকের মধ্যে একজনের অর্থনৈতিক অবস্থার আগের থেকে অবনতি হয়েছে এবং তাদের প্রায় সবাই ভবিষ্যতে কী হবে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। দেশে ফিরে এসে কাজ খুঁজে নিলেও যারা কাজ করছেন তাদের ৮৫ শতাংশ তাদের বর্তমান কাজ নিয়ে হতাশাগ্রস্ত এবং ৫৭ শতাংশ তাদের জীবন ও জীবিকা নিয়ে চিন্তিত। বিদেশেও যে তারা অনেক কষ্টে ছিলেন তাও জরিপে উঠে এসেছে। ৫২ শতাংশ নারী শ্রমিক বলেছেন তারা বিদেশে জবরদস্তিমূলক শ্রমের শিকার হয়েছেন, ৬১ শতাংশ বলেছেন তারা বিদেশে খাদ্য ও পানির অভাবে ভুগেছেন। সমস্ত লজ্জা অতিক্রম করে এবং ভবিষ্যতের জটিলতার কথা বিবেচনায় নিয়েও ৭ শতাংশ নারী বলেছেন তারা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন এবং ৩৮ শতাংশ বলেছেন তারা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বিদেশফেরত নারী শ্রমিকের ৬০ শতাংশ নারী শ্রমিক বেকার, ৬৫ শতাংশ শ্রমিকের নিয়মিত মাসিক কোনো আয় নেই আর ৬১ শতাংশ এখনো ঋণ শোধ করতে না পেরে ঋণের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছেন।

উপরোক্ত নির্মম বাস্তবতা সত্ত্বেও দেশে আইন বাস্তবায়ন না হওয়ায় বিদেশ থেকে ফেরা নারী শ্রমিকরা অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত। নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, যে কাজের কথা বলে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে তাদের সেই কাজ করানো হয় না। তার চেয়ে নিম্নস্তরের কাজ করতে বাধ্য হন তারা। এ বিষয়টি তদারকি করার ব্যবস্থা তেমন নেই। যারা শ্রমিক পাঠায় তারা এর দায়িত্ব কি নেবেন না?

অনেক নারী যে রকম নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়ে থাকেন, তার তুলনায় রতœাকে বলতে হবে সৌভাগ্যবতী। যেমন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কিশোরী উম্মে কুলসুম (১৪) পাসপোর্টে বয়স ২৬ দেখিয়ে সৌদি আরবে যায় ২০১৯ সালের এপ্রিলে। সপ্তম শ্রেণির পাট চুকিয়ে দিয়েছিল সে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় আর অভাবগ্রস্ত পরিবারের জন্য কিছু করার স্বপ্নে। গৃহকর্মী হিসেবে সৌদিতে যাওয়ার পর সাত মাস নিয়মিত টাকা পাঠায়। হঠাৎ পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ছয় মাস পর কুলসুম ফোন করে জানায়, মালিক মেরে তার হাত-পা ও কোমর ভেঙে দিয়েছেন। ২০২০ সালের ১০ আগস্ট মেয়ের মৃত্যুর খবর পায় কুলসুমের পরিবার। সংসারের সুখের জন্য জীবন বাজি রাখা মেয়েটি জীবন হারাল শেষ পর্যন্ত। মেয়েকে হারাল, পরিবারের সুখের আশার সমাধি হলো কিন্তু এখন পর্যন্ত পরিবারটি মেয়ের মৃত্যুজনিত কোনো আর্থিক সহায়তা পায়নি। কুলসুমের মতো গত পাঁচ বছরে প্রবাস থেকে ৪৮৭ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে এসেছে। এর মধ্যে আত্মহত্যা করেন ৮৬ জন, স্ট্রোকে মারা গেছেন ১৬৭ জন এবং দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৭১ জন। বলা হয়েছে, ১১৫ জন নাকি স্বাভাবিক মৃত্যু বরণ করেছেন! এই কথা মেনে নেওয়া ছাড়া পরিবারগুলোর আর কোনো উপায় না থাকলেও রাষ্ট্রের ভূমিকা কী, সেই প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। এ কথা উল্লেখযোগ্য যে, বেশির ভাগ মৃত্যুর ঘটনাই ঘটে এবং ঘটে চলেছে সৌদি আরবে।

গবেষণা থেকে আরও দেখা যাচ্ছে, বিদেশফেরত নারী শ্রমিকদের শারীরিক স্বাস্থ্যের অবস্থা ভালো নয়। পরিশ্রম, অপুষ্টি এবং নানা ধরনের চাপের কারণে ৫৫ শতাংশ শ্রমিক শারীরিকভাবে অসুস্থ, ২৯ শতাংশের মানসিক অসুস্থতা রয়েছে এবং মানসিক অসুস্থদের মধ্যে ৮৭ শতাংশ শ্রমিক কোনো চিকিৎসা পাননি। সামাজিক ও পারিবারিকভাবে নানা ধরনের কুৎসা ও অপবাদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে অনেককেই। এমনকি ৩৮ শতাংশ নারী শ্রমিক বলেছেন, দেশের সমাজে তাদের চরিত্র নিয়েও সন্দেহ করা হয়।

যে টাকা তারা পাঠান সেই টাকার মালিকও অনেক সময় তারা হন না, আবার অনেক নারী শ্রমিকের তো সংসারে বিচ্ছেদ ঘটে যায়। যে পরিবারের জন্য বিদেশে যাওয়া, যে দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানো সেই পরিবার ও দেশ যদি তাদের দুঃখে পাশে না দাঁড়ায় তাহলে এর চেয়ে বড় দুঃখ আর কী হতে পারে? তাই শুধু রেমিট্যান্স ও লাশ গোনা নয় কর্মজীবী এই নারীদের সম্মান ও সুরক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজকে নিতেই হবে।

লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট

rratan.spb@gmail.com

উৎস: দেশ রুপান্তর

Facebook Comments Box


Comments

comments

advertisement

Posted ৮:৩৭ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ০২ অক্টোবর ২০২১

সংবাদমেইল |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. মানজুরুল হক

নির্বাহী সম্পাদক: মো. নাজমুল ইসলাম

বার্তা সম্পাদক : শরিফ আহমেদ

কার্যালয়
উপজেলা রোড, কুলাউড়া, মেলভীবাজার।
মোবাইল: ০১৭১৩৮০৫৭১৯
ই-মেইল: sangbadmail2021@gmail.com

sangbadmail@2016 কপিরাইটের সকল স্বত্ব সংরক্ষিত