পিলখানা হত্যা: হাইকোর্টের সর্বসন্মত রায় সোমবার

সংবাদমেইল ডেস্ক | ২৬ নভেম্বর ২০১৭ | ১১:৩৭ অপরাহ্ণ
অ+ অ-

রাজধানীর পিলখানায় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদরদফতরে রক্তস্নাত বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ চৌকশ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে নৃশংস, বর্বোরোচিত ও নজিরবিহীন হত্যাযজ্ঞের মামলায় হাইকোর্ট বিভাগের রায় জানা যাবে সোমবার। তিন বিচারপতির সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে এ রায় দেয়া হবে। রোববার রায়ের পর্যবেক্ষণ পড়ার এক পর্যায়ে এ কথা জানান তিন সদস্যের এই বৃহত্তর বেঞ্চের প্রিসাইডিং জাজ বিচারপতি মো. শওকত হোসেন।

পিলখানা হত্যা মামলার রায়ের ঘোষণা মুলতবি রাখা হয়েছে। সোমবার সকাল সাড়ে দশটা থেকে আবারো রায়ের পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন শুরু করা হবে। পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন শেষে রায়ের মূল অংশ পড়বেন বিচারপতিরা। রোববার বিকেলে দিনের কার্যক্রম শেষ করে এ সিদ্ধান্ত দেন আদালত।



দেশজুড়ে বহুল আলোচিত এ মামলার হাইকোট বিভাগের বিশেষ এই বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার। আসামির সংখ্যার দিক দিয়ে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এ মামলার রায় রোববার সকাল ১০টা ৫৪ মিনিটে পড়া শুরু করেন তিন বিচারপতি। আদালতের রায় ঘোষণা শুরু করার আগেই বিচারপতি মো. শওকত হোসেন উপস্থিত আইনজীবী ও সাংবাদিকদের জানান, ন্যাক্কারজনক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রায়ের বিষয়ে আমরা তিন বিচারপতি একমত।

মাঝখানে এক ঘণ্টা বিরতি দিয়ে প্রথম দিন বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী তার হাজার পৃষ্ঠার পর্যবেক্ষণ পড়ে শোনান। বিকেল ৪টায় বিচারপতি মো. শওকত হোসেন বলেন, বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী তার রায়ের অংশ পড়া শেষ করেছেন। সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় আবার আদালত বসবে ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার তার পর্যবেক্ষণ সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরবেন। আশা করি, আগামীকাল (আজ) দুপুরের আগেই আমরা মূল রায় দেয়া শুরু করতে পারব।

আদালত বলেন, এই রায়ে প্রায় এক হাজার পৃষ্ঠার বেশি অবজারভেশন (পর্যবেক্ষণ) দেবো। রায়টি সবমিলিয়ে ১০ হাজার পৃষ্ঠার বেশি। পুরো রায় পড়ব না। তবে পুরো পর্যবেক্ষণটি আমরা পড়ে শোনাবো। পূর্ণ পর্যবেক্ষণ শেষে আমরা সামারিলি জাজমেন্ট (সংক্ষিপ্ত রায়) দেবো। সেখানে রায়ের ফাউন্ডেশন (মূল ভিত্তি) অংশে কে কোন কারণে কী সাজা পেয়েছেন তা আমরা উল্লেখ করবো। এ কারণে সময় লাগছে।’

আদালত আরো বলেন, ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। এত অল্প সময়ে ৫৭ জন সেনাকে হত্যার ঘটনা পৃথিবীর আর কোথাও ঘটেনি।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, ২০০৯ সালে পিলখানা হত্যা মামলায় কয়জন আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকবে, কয়জন আসামির যাবজ্জীবন বহাল থাকবে, কতজন খালাস পাবেন- এসব দণ্ডের বিষয়ে তিন বিচারপতিই একমত হয়েছেন বলে আদালত জানিয়েছেন। পিলখানা হত্যা মামলার রায় নিয়ে রোববার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে গণমাধ্যমকে এ বিষয়ে অবহিত করেন তিনি।

অ্যাটর্নি জেনারেল সাংবাদিকদের বলেন, এ মামলায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে শুনানি হয়েছে। আজ এ মামলার রায় পড়ছেন আদালত। পূর্ণাঙ্গ রায় যদি পড়া হয়, তাহলে সময় লাগতে পারে। তিনি বলেন, প্রথমে হয়তো আসামিদের অর্ডার পোরশন (আদেশের অংশ) দেয়া হবে। পরে আসামির চূড়ান্ত রায় আসতে পারে। এ মামলাটি পৃথিবীর ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য একটি মামলা বলে উল্লেখ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

এদিকে বিডিআর জওয়ানদের ওই রক্তস্নাত বিদ্রোহের পর ৫৭টি বিদ্রোহের মামলার বিচার হয় বাহিনীর নিজস্ব আদালতে। আর হত্যাকাণ্ডের বিচার চলে বকশীবাজারে আলিয়া মাদরাসা মাঠে স্থাপিত মহানগর দায়রা জজ আদালতের অস্থায়ী এজলাসে।

ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. আখতারুজ্জামান ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ওই রায়ে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেয়া বিডিআরের উপ সহকারী পরিচালক তৌহিদুল আলমসহ বাহিনীর ১৫২ জওয়ান ও নন কমিশন্ড কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। পাশাপাশি তাদের প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়। এ মামলার সাড়ে ৮০০ আসামির মধ্যে ওই রায়ের দিন পর্যন্ত জীবিত ছিলেন ৮৪৬ জন। তাদের মধ্যে ১৬১ জনকে দেয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। পাশাপাশি অস্ত্র লুটের দায়ে তাদের আরো ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জারিমানা, অনাদায়ে আরও দুই বছরের কারাদণ্ড দেন বিচারক। এছাড়া ২৫৬ আসামিকে তিন থেকে ১০ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেয়া হয়। কারো কারো সাজার আদেশ হয় একাধিক ধারায়। আর অপরাধে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় রায়ে ২৭৭ জনকে বেকসুর খালাস দেন বিচারিক আদালত। পরে রায়ের বিরুদ্ধে খালাসপ্রাপ্ত ২৭৭ জনের মধ্যে ৬৯ জন আসামির সর্বোচ্চ সাজা চেয়ে হাইকোর্টে ফৌজদারি আপিল ও ডেথ রেফারেন্স দায়ের করে রাষ্ট্রপক্ষ। অন্যদিকে দণ্ডপ্রাপ্ত ৪১০ জন আসামির সাজা বাতিল চেয়ে আপিল করেন তাদের আইনজীবীরা।

এর মধ্যে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েক আসামির মৃত্যুদণ্ড ও কয়েকজনের সাজা বাড়াতে আরো দুটি আবেদন করেছিল রাষ্ট্রপক্ষ। কিন্তু দেরিতে আবেদন করায় ১৩ এপ্রিল আবেদন দুটিও বাতিল করে দেয় হাইকোর্ট বিভাগ। পরে এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশই বহাল রাখে। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর ১৩ এপ্রিল মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান (সিএভি) রাখেন আদালত। তার সাত মাস ১২ দিন পর গতকাল নৃশংস হত্যকাণ্ডের রায় ঘোষণা শুরু করেন হাইকোর্ট বিভাগ।

এ মামলার রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা, মোমতাজ উদ্দিন ফকির, মোশাররফ হোসেন কাজল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোশাররফ হোসেন সরদার, শেখ বাহারুল ইসলাম ও জাহিদ সরওয়ার কাজল।

অপরদিকে আসামিপক্ষে আইনজীবী ছিলেন খন্দকার মাহবুব হোসেন, আবদুল বাসেত মজুমদার, মহসীন রশীদ, এস এম শাহজাহান, এ এস এম আবদুল মুবিন, মো. আমিনুল ইসলাম, দাউদুর রহমান মিনা ও শামীম সরদারসহ আরও অনেকে। আসামিপক্ষে রাষ্ট্র নিয়োজিত আইনজীবী ছিলেন হাসনা বেগম।

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদর দফতরে রক্তাক্ত বিদ্রোহের সময় সৈনিকদের হাতে নারকীয় হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন। বর্বোরোচিত ওই ঘটনার পর ২০০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি লালবাগ থানার তত্কালীন ওসি বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এরপর সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহহার আকন্দ মামলাটি তদন্ত করেন। তাকে সহযোগিতা করেন পুলিশের ২০০ কর্মকর্তা। প্রায় ৫০০ দিন তদন্তের পর ২০১০ সালের ১২ জুলাই আদালতে হত্যা ও অস্ত্র বিস্ফোরক আইনে দুটি চার্জশিট জমা দেয় সিআইডি। এতে ৮২৪ জনকে আসামি করা হয়। পরে অধিকতর তদন্তে আরো ২৬ জনকে অভিযুক্ত করে বর্ধিত চার্জশিট দাখিল করা হয়। সব মিলে আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৫০ জনে।

সংবাদমেইল/এএস

Comments

comments

পড়া হয়েছে 845 বার
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
x