কুলাউড়ায় বরবটি চাষ করে স্বাবলম্বী ২৫ গ্রামের কৃষক

স্টাফ রিপোর্টার: | ০৩ মে ২০২১ | ৪:৪৪ অপরাহ্ণ
অ+ অ-

কুলাউড়ায় বরবটি(রামাই) চাষ করে ২৫ টি গ্রামের শত শত কৃষক পরিবার ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে। এ সবজি বিক্রি করে এখন তারা অনেক স্বাবলম্বী। এসব বরবটি(রামাই) মজাদার ও সুস্বাধ্য হওয়ায় সিলেট অঞ্চলের লোকজনের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়। ইংল্যান্ড, আমেরিকা, কানাডাসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের প্রবাসীরা তাদের প্রিয় এই সবজিটি চাষ হওয়ার পরে এর স্বাধ নিতে তাদের আত্মীয়স্বজন এবং বিভিন্ন মাধ্যমে নিতে ব্যাকুল হয়ে উঠেন।

সরেজমিন উপজেলার ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, শীতকালে কৃষকরা আমন ধান কাটা শেষ করলে ৬ মাস জমি ফাকা পড়ে থাকে। এই সুযোগে বরবটি চাষিরা জমি প্রস্তুত করে মাঘ মাসের শেষ দিকে বরবটি বীজ জমিতে রোপন করেন। চৈত্র ও বৈশাখের সময় এই ফসল পরিপূর্ন হলে কৃষকরা তা সংগ্রহ করে বিক্রির জন্য হাটে নিয়ে যান। এই বরবটি চাষে উপজেলার মধ্যে ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের ২৫ টি গ্রামের প্রায় ছয় শতাধিক পরিবার প্রতিবছর আগ্রহী হয়ে উঠেন। তাঁরা এখন বরবটি চাষ করে সাফল্যের পাশাপাশি এখন অনেক স্বাবলম্বী। তাদের অনেকেই এই সবজি বিক্রি করে হয়েছেন লাখপতি। এখানে উৎপাদিত বরবটি মৌলভীবাজার তথা সিলেট বিভাগের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করে বরবটি থেকে প্রতিমাসে আয় হয় প্রায় প্রায় দুই কোটি টাকা। কুলাউড়া উপজেলার ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের পশ্চিম জালালাবাদ, পশ্চিম গুড়াভুই, কোনাগাঁও, শ্রীপুর, নবীনগর, নছিরাবাদ, লামাপাড়া, চকেরগ্রাম, টিলাগাঁও, মির্জাপুর, গোবিন্দপুর, মৌলভীগাঁও, হরিণগর, হিঙ্গাজিয়া সহ আশপাশ এলাকার ছয় শতাধিক পরিবারের লোকজন বরবটি চাষে ওতোপ্রতভাবে জড়িত রয়েছে। এছাড়াও কাদিপুর ইউনিয়নের হোসেনপুর, কাদিরপুর, ছকাপন, মেয়ারমহল ও বরমচাল ইউনিয়নের দিঘাইছড়া নদীর দক্ষিণ তীরের অদূরে প্রায় ৭০ একর জমিজুড়ে কৃষকরা বরবটি চাষ করছেন। বরবটি সবজি কৃষকরা রাতে জমি থেকে উত্তোলন করে সারারাত লোকজন দিয়ে বাঁছাই করে কেজি আকারে (আটি) বেঁধে রাখেন। এরপর সকাল হলেই এই কৃষকরা দলবেধেঁ নির্ধারিত হাট (সবজি পয়েন্ট) ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের শ্রীপুর বাজারে নিয়ে যান। সেখানে ভোররাত থেকেই সিলেট,মৌলভীবাজার,সুনামগঞ্জ,হবিগঞ্জ ও দূরদূরান্তের পাইকাররা গাড়ি নিয়ে উপস্থিত হন। কৃষকরা যার কাছে সবজির ভালো দাম পাবে তার কাছে মাল বিক্রি করে দেন।



ব্রাহ্মণ বাজার ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের বরবটি চাষী বাদল মিয়া,ফুয়াদ মিয়া,মজিদ মিয়া,বশির মিয়া,হেলিম উদ্দিন,মছব্বির আলী,মিন্টু দাস,হরেশ চন্দ্র,বিকাল পাল,দিরেন্দ মোহন, জুবেল মিয়া,রুমন মিয়া,রাসেল আহমদ,সুমন মিয়া,সমছু মিয়া,খালিক, মাসুক মিয়া, লাল মিয়া, সাজিদ মিয়া, সুকুমার চন্দ দেব পেয়ারা বেগম,নাজু বেগম,আমেনা ও রিতা সহ অনেকেই বরবটি চাষ করে তাদের জীবনের গতিপ্রবাহ পাল্টে দিয়েছেন। প্রতিবছর র্সজন সময়ে এই সবজি চাষ করে তা বিক্রি করে তাঁরা এখন অনেকেই লক্ষ লক্ষ টাকার মালিক।

তাদের কাছ থেকে জানা যায় , এক বিঘা জমিতে বরবটি চাষ করতে প্রায় ৩৫-৪০ হাজার টাকা খরচ হয়। চাষ প্রক্রিয়া শেষে বিক্রীত সবজি থেকে আয় হয় ৭০-৮০ হাজার টাকার বেশি। অনেক সময় বৃষ্টিপাত না হলে পানির পাম্প দিয়ে নালা বা পুকুর থেকে পানি দিতে হয় সবজি ক্ষেতে। এছাড়াও কীট-পতঙ্গের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে বিভিন্ন কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়। যা অনেক ব্যয়বহুল। কৃষকদের দাবি সরকারিভাবে এসব সবজি ক্ষেতে ৫-৬ টি গভীর নলকূপ বসানো হলে কৃষকদের কষ্ট অনেকটা লাগব হবে। নলকূপ স্থাপন হলে শুধু বরবটি নয়, রবিশস্য এ অঞ্চলের চাষীদের ভাগ্য বদলে দিতে পারে বলে তারা আশাবাদী। অগ্রহায়ন মাসে আমন তুলে এ জমিতে কৃষকরা বরবটি চাষ শুরু করেন। বীজ রোপণ থেকে তিন মাসে ফসল আসতে থাকে। চৈত্র মাসের শেষদিক থেকে সংগ্রহ ও বিক্রি শুরু হয়। এ সবজি চাষে জৈব ও রাসায়নিক সার ব্যবহারে গাছ পুষ্ট হয়। কৃষকরা পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে বরবটি মণপ্রতি গড়ে ১০০০-১২০০ টাকা দরে বিক্রি করেন। প্রতিদিন দেড় থেকে দুই লাখ কেজি গড়ে বিক্রি হয় প্রায় ১০ লাখ টাকায়। এ হিসাবে এক মাসে বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ কোটি টাকা। গাছ থেকে এ ফলন দেড় থেকে দুই মাস সংগ্রহ করা যায়। প্রতি সপ্তাহে ২-৩ দিন ফসল সংগ্রহ করা হয়। সিলেট বিভাগের মানুষের প্রয়োজনে সবজি হিসেবে ব্যবহƒত হয়। প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে এ সবজির কদর বেশি বলে কৃষকরা জানান।

কৃষকরা আরো জানান, সবজি চাষে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সাফল্য আসলেও গত বছর থেকে এবারও করোনা ভাইরাসের কারনে দেশে লকডাউন জারি থাকায় তাদের বিক্রিতে চরম ভাটা পড়েছে। পাইকাররা আগেরমতো গাড়ি নিয়ে আসতে পারেননা। কৃষকরা সবজি নিয়ে হাটে উঠলেও পাইকার ক্রেতা কম থাকায় অনেক সময় কম দামে সবজি বিক্রি করতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে এ সবজি চাষে অনেক কৃষকরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।

ব্রাহ্মনবাজার ইউপি চেয়ারম্যান প্রভাষক মমদুদ হোসেন বলেন, কম খরচে বেশি লাভ থাকায় বরবটি চাষে ঐ এলাকার কৃষকরা অনেক আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। আমার পরিষদের পক্ষ থেকে তাদের জন্য সর্বাত্মক সহযোগীতা প্রদান করা হবে।

কুলাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মুমিন বলেন, ওই এলাকার কৃষকরা বরবটি চাষে বেশ সাফল্য দেখিয়েছেন সেটা শুনেছি। আমরা তাদেরকে রোগবালঅই সম্পর্কে নানা তথ্য ও পরামর্শ দিচ্ছি। কিন্তু সরকারীভাবে তাদেরকে কোন আর্থিক সহযোগীতার জন্য বরাদ্ধ আমাদের কাছে নেই।

Comments

comments

পড়া হয়েছে 126 বার
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
x