সোমবার ১৫ আগস্ট, ২০২২ | ৩১ শ্রাবণ, ১৪২৯

‘অসহায় প্রবাস’

অনলাইন ডেস্ক : | রবিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ | প্রিন্ট  

‘অসহায় প্রবাস’

পরিবার, সংসার, ভবিষ্যৎ ও জীবিকার তাগিদে ২০১৮ সালে অনার্সের বইপত্র টেবিলে রেখেই চলে আসলাম ইরাক। নিজের নাম যুক্ত হলো রেমিটেন্স যোদ্ধার খাতায়; অর্জিত হলো বাস্তব অভিজ্ঞতা। ক্লাসের ফাস্টবয় হয়ে অনেক বুদ্ধিমান ভাবা নিজেকে আজ নিতান্তই বোকা মনে হচ্ছে। বীজগণিতের কোনো সূত্রই যে আজ আমার কাজে লাগছে না। যাদের চাইতে নিজেকে সম্ভ্রান্ত বানাতে প্রবাসে আসলাম- সেই রিকশাচালক, ভ্যানচালক, কৃষক, কুলি তাদেরই প্রকৃত বুদ্ধিমান মনে হচ্ছে।

তাদের অভিজ্ঞতাকে প্রতিনিয়ত স্যালুট জানাতে ইচ্ছে করছে। কারণ ত্রিকোণমিতিক, জ্যামিতিক এসব তো আজ আমার কাজের অভিজ্ঞতা হিসেবে কেউ গ্রহণ করছে না; সবাই চাচ্ছে ড্রাইভিং জানি কিনা, কারেন্টের কাজ জানি কিনা, ওয়েল্ডিং, কম্পিউটার এসব কাজ জানি কিনা, কুলির কাজ করতে পারব কিনা- এর সব কিছুই যে আমার সিলেবাসের বাইরে সেটা প্রকাশ করবো কীভাবে। আমি তো আরবি জানি না। স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে ১৩ বছর ইংরেজি; যা শিখছি সেখানে তো ছিল paragraph, composition, naration, tag question etc. এসব তো কেউ আমাকে লিখিত পরীক্ষা নেয় না। সবাই জানতে চায় ইংরেজি বলতে পারি কিনা। কিন্তু আমার সিলেবাসে যে ইংরেজি বলার কোনো পার্ট ছিল না। নিরুপায় হয়ে কোনো রকম একটা হোটেল ক্লিনারের কাজে চলে গেলাম। গিয়ে দেখি এক বাঙালি রান্নার কাজ করে বেতন এক লাখ টাকা পান। পরিচিত হয়ে জানতে পারলাম সে দেশে বাবুর্চির কাজ করত।


গভীর রাতে চিন্তা করলাম দেশের বাবুর্চি বলে ছোট করা লোকটা এখানে কত মর্যাদা পায়। আমার চাইতে চারগুণ বেশি বেতন পায়। প্রথমে খুব হিংসে হতো; পরে নিজেকে মানিয়ে নিলাম। তেরো বছরে ইংরেজি বলতে না পারা আমি জীবনের তাগিদে ছয় মাসে আরবি শিখে গেলাম। এখন আমি ভাষা জানি মানে আমি একটা অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি বাইরে ভালো বেতনে একটা কাজ পাব।

চাকরি পাল্টে চলে গেলাম অন্য এক জায়গায়। হসপিটালে ডাক্তারদের সহযোগী হিসেবে কাজ করা শুরু করলাম। হঠাৎ এক বাঙালির সঙ্গে দেখা। সে নাপিতের কাজ করে মাসে দেড় লাখ টাকার মতো ইনকাম করে। অথচ এদের দেশে নাপিত বলে সালাম দিতেও হিংসে হতো। সারা দিন কাজ শেষে বাসায় গিয়ে রান্না চড়িয়ে রুমে প্রশান্তি নিচ্ছি। ওদিকে তরকারি পুড়ে কালো হয়ে গেছে। গোসল সেরে খাওয়া-দাওয়া শেষ। বাড়িতে ফোন দিলাম। সামনে ঈদ মোটা অংকের টাকা দরকার কিন্তু আমার যে মাস শেষ হয়নি, কীভাবে ম্যানেজ করব টাকা। কাল থেকে ডিউটি শেষে পার্টটাইম কাজ করব।


এভাবেই শিখে গেলাম কুলির কাজ। ঈদ চলে আসছে, সবাই জানতে চাইল জামাকাপড় কিনছি কিনা কিন্তু আমি যে কুলির কাজ করি আমার কি পেন্ট-টাই মানাবে? ভালো কাপড়-চোপড় কেনার মতো অনেক টাকা আমার আছে কিন্তু এই কাপড় পরে যাবো কোথায়? ঈদ তো শেষ, এত পরিশ্রমের কাজ আর পারছি না। একটু ভালো চাকরির আশায় এদিক-ওদিক ছোটাছুটি কে দেবে কাজ। কাকে বিশ্বাস করব। অনেকে যে কাজের কথা বলে নিয়ে জিম্মি করে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করে। এভাবেই পেরিয়ে গেল তিনটি বছর। এদিকে পাসপোর্টের মেয়াদও শেষ। গেলাম পাসপোর্ট অফিসে; সেখানে যে দালালি না দিলে কাজ হচ্ছে না।

এভাবেই প্রতিনিয়ত প্রবাসীরা অসহায় হয়ে পার করে দেয় বছরের পর বছর। বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ করব প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন শ্রমিক বিদেশে রপ্তানি করবেন; তাহলেই রেমিটেন্সের অঙ্ক যেমন বড় হবে, তেমনি ছোট হবে প্রবাসীদের অসহায়ত্বের লেখা গল্পের পরিমাণ। সূত্র: যুগান্তর


Facebook Comments Box

Comments

comments

advertisement

Posted ১:০৫ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১

সংবাদমেইল |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. মানজুরুল হক

নির্বাহী সম্পাদক: মো. নাজমুল ইসলাম

বার্তা সম্পাদক : শরিফ আহমেদ

কার্যালয়
উপজেলা রোড, কুলাউড়া, মেলভীবাজার।
মোবাইল: ০১৭১৩৮০৫৭১৯
ই-মেইল: sangbadmail2021@gmail.com

sangbadmail@2016 কপিরাইটের সকল স্বত্ব সংরক্ষিত