শিক্ষাক্ষেত্রে এক জন সফল স্বপ্নদ্রষ্টা

লুৎফুর রহমান রাজুঃ | ১৭ অগাস্ট ২০১৮ | ৪:৫৬ অপরাহ্ন
অ+ অ-

যুগে যুগে কালে কালে যেসব মানুষ ভোগে নয় ত্যাগেই প্রকৃত সুখ প্রতিপাদ্যকে মন-মগজে, মেধায়-মনণে ধারণ করে, অসহায় মানুষদের বুকে আগলে রেখে সুখে দু:খে বটবৃক্ষের ন্যায় ছায়াময় আশ্রয় দিয়ে নিজকে অমর করেছেন, তেমনই একজন মহান মানবী যার অক্লান্ত বিরামহীন প্রচেষ্টায় একটি এলাকাকে শিক্ষাক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে দেখেছি।যিনি প্রমান করেছেন ইচ্ছা থাকলে যেকোন মানুষই পারে সভ্যতার শিক্ষানামক চাকাকে ঘুরিয়ে কোন একটি এলাকাকে শিক্ষার সর্বচ্চ শিখড়ে নিয়ে যাওয়া যায়।যার নাম শুনলে পুরো কুলাউড়া উপজেলা সহ পুরো সিলেট বিভাগ বলে উনিই হলেন আমাদের দেশের বেগম রোকেয়া নামক আরেক আলোকবর্তিকা। বরমচাল আদর্শ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাণ মিসেস জুন্নারা বেগম।আমি বা আমরা পরম শ্রদ্ধার সাতে বলি তিনিই আমাদের জুন্নারা আপা।

পেচনের কথাঃ



সালটা ছিল৫ ই মার্চ১৯৮৪।রঙিন স্বপন এলাকায় একটি বিদ্যালয় করার।তখন বরমচালের সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন মরহুম জনাব মজিদুল্লাহ সাহেব। যেই ভাবা সেই কাজ।

শুরু হল আরেক ইতিহাস গড়ার নতুন অধ্যায়ের শুভসূচনা। নির্বাচন করা হল কোথায় বিদ্যালয়টি যাত্রা শুরু করবে?

তখন বরমচাল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রদ্ধেয় মরহুম জনাব আব্দুল মুহিত সাহেবের সাথে আলাপচারিতায় তিনি খুশি হয়ে ঐ বিদ্যালয়ের উপর একটি কক্ষে ক্লাশ চালু করার পরামর্শ দিলেন।  সাথে ছিলেন এলাকার আরেক প্রাণপুরুষ মরহুম জনাব আব্দুস শহীদ চৌধুরী (মাসুক  মিয়া),   এ্যাডভোকেট জনাব ছালিক আহমদ চৌধুরী। আপাদত জায়গার অভাবটা যে শেষ হল।ক্রয় করা হল সব শিক্ষা উপকরণ।

কিন্তু বাকি কাজটাতো আর সহজব্যাপার নয়।উপস্থিত সবার সম্মতিতে বিদ্যালয়ের নামকরন করা হলো বরমচাল আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়। সভাপতি নির্বাচন করা হল মরহুম জনাব নুরুল ইসলাম ও সম্পাদক জনাব মফিজুন্নুর চৌধুরী(ফারুক)কে।  কিন্তু কাকে বানানো হবে বহু প্রতিক্ষিত শিক্ষক।    তখন মরহুম জনাব মজিদুল্লাহ সাহেবের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় মফিজুন্নুর চৌধুরীকে রাজি করানো হল আপনার স্ত্রীই হবেন প্রধান শিক্ষিকা।  এখন যে আরেকটি কাজ বাকি রয়ে গেল। শিক্ষাদানের জন্যযে চাই আরো কিছু আদর্শবান শিক্ষক। যাদের হাত ধরে একেক করে আলোকিত হবে একেকটি সমাজ।শিক্ষক নির্বাচনের ক্ষত্রে যে প্রয়োজন গুনগতমানের ও শিক্ষক।এলাকাতে খুজ নিয়ে নিয়োগ দেয়া হল কয়েকজন।

সহকারি শিক্ষিকা পেয়ারা বেগম ও লিলি বেগম,শেফালি বেগম,হেনা বেগমকে।কিন্তু কিছু দিন যেতেই তারা ব্যাক্তিগত কারনে অনেকেই বাধ দিয়ে দেন।এর পর আবার নিয়োগ দেওয়া হল প্রথমে নাজরীন আক্তার,নাজমা আক্তার,আব্দুর রহমান চৌধুরী মহোদয়গনকে।কিন্তু তার পরেও তিনি যে একজন নারী ।এই তিন জনকে নিয়ে আবারো সামনে অগ্রসর।যে করে হোক বিদ্যালয় পরিচালনা করব।বিদ্যালয় করার দিপ্তবাসনায় ধিরে ধিরে সূচনা হল প্রস্তুতি।কাজটা কিন্তু চ্যালেঞ্জিং অনেক বাধা যে আসবে এই কাজে।তাতে দমবার পাত্র যে তিনি নন।তাঁর কথা ভালো কাজে,আসব পথে আধার নেমে তাই বলে কি রইব থেমে।  শুরু হল নতুন পদযত্রা।

আসি আপার মূল কথায়ঃ

বিদ্যালয় পরিচালনা করব কিন্তু এতেতো অনেক আর্থিক যোগান প্রয়োজন। দিতে হবে দূর্গম পথ পাড়ি।এ সময় তার সাথে থেকে যে সাদামনের মানুষটি সর্বচ্চ উৎসাহ প্রদান করে গিয়েছেন বিরামবিহীন ভাবে সেই মহান ব্যাক্তিটি যে তাঁর স্বামী জনাব মুফিজ্জুন্নুর চৌধুরী(ফারুক)। মনের ভেতর সাহসটা যে পুরোই বেড়ে গেল।কাজের গতি দ্রুত গতিতে সম্মুখভাগে অগ্রসর হতে লাগল।ধিরে ধিরে তাদের সাতে যোগ হতে শুরু হলেন এলাকার আরো অনেক মহৎ মনের অধিকারি। শুরু হল এলাকায় প্রতিটি বাড়িতে বাড়িতে পদচারনা।মানুষের সাতে কতাবার্তা।

এলাকাবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত সাড়াদানে মনবল গেলে বহুগুন বেড়ে।সবাই লাগলেন বিদ্যায়ল নির্মানের সহযোগীতার সোনালী হাতখানা প্রসারিত করতে।কেউ কেউ আবার ভালো সুপরামর্শ দিয়ে।আর পেচনে তাকাতে হয়নি জুন্নারা আপাকে। ছাত্রছাত্রী ভর্তি কার্যক্রম একেক করে সম্পন্ন হল।ক্লাশ হল শুরু।একটি মাত্র রোমে ভাগ করে কয়েকটি ক্লাশ।পাঠদানে কিছুটা সমস্যা হলেও ক্লাশের যাত্রা শুরু হল।কিছু দিন যেতেই বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রী সংখ্যা দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি হতে লাগল।শুরু হল আরেক জটিলতা এখন এতো ছাত্রছাত্রীকে কোথায় বসতে দেয়া যায়।উপায় একটি বের করা হল যেহেতু জায়গার সমস্যা এখন সবাই ফ্লোর (মেঝে)তে বসে ক্লাশ করবে।আনা হল কিছু চটের বস্তা।

আবারো জায়গার অভাবটা কিছুটা দূর হল।নতুন বিদ্যালয় নতুন নতুন মুখ।প্রানবন্ত ক্লাশরুম।বছর শেষে ফলাফল ও দেখা গেল অনেক ভালো।কিন্তু ফলাফল ভালো হলে কি হবে শিক্ষকদের যে পারিশ্রমিক কেউ দিতে চায় না।তাতে কি শিক্ষাদান থেমে যাবে।নিজের সাধ্যমত অর্থ,শ্রম,মেধা সব কিছু দিয়ে বিদ্যালয় চালিয়ে নিতে লাগলেন মিসেস জুন্নারা বেগম।এ সময় কোন প্রকার পারিশ্রমিক ছাড়াই জানাব মফিজুন্নুর চৌধুরী, এ্যাডভোকেট ছালিক আহমদ চৌধুরী ইসহাক চৌধুরী ইমরান,আরো কয়েক জন মহান বেক্তি এগিয়ে এলেন।

এভাবে রেজিয়া আক্তার, নাজরীন সুলতানা ও আব্দুর রহমান স্যারকে নিয়ে কেটে গেল দশটি বছর।
সালঃ১৯৯৪ বিদ্যালয় রেজিষ্টেশন

স্থান পরিবর্ত করার পর রেজিস্টারি করা হল বিদ্যালয় টি।বছরের পর বছর ফলাফল আশানুরূপ ভালো।তার সাথে ছাত্রছাত্রী অধিক হারে ভর্তি হওয়ায় আবারো জায়গা সমস্যা ব্যাপক আকার ধারন করে।কিন্তু ইতি মধ্যে টানা কয়েক বছর ভালো ফলাফল ধারাবাহিতা বজায় রাখায় বিদ্যালয়টি পুরো কুলাউড়া উপজেলা ততা মৌলভীবাজার জেলার মধ্যে সবার দৃষ্টিগোচর হয়ে গেল।আসল বিদ্যালয়ের জন্য নতুন একটি ভবন।জায়গা নির্ধারন করা হল মরহুম জনাব আব্দুল মুহিত স্যারের সহযোগীতায় বরমচাল উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের কিছুটা দক্ষিণ পাশে।

নতুম ভবন পেয়ে সবার উদ্দীপনা আবারো বহুগুন বেড়ে গেল।সেই সাথে পড়ালেখার মান ও ধারাবাহিতার সাথে দ্বিগুণ গতিতে অগ্রসর হতে লাগল।১৯৯৬ সাল থেকে ধারাবাহিক ভাবে বিদ্যালয়ে বৃত্তি আসা আরাম্ভ হয়ে গেল।আর পেচন ফিরে তাকাতে হয়নি বিদ্যালয়ে স্বপ্নদ্রষ্টা মিসেস জুন্নারা বেগমকে।

বিদ্যালয় সরকারীকরণঃ

২০১৩সাল বিদ্যালয় টি সরকারীকরণ করা হল।এতে করে মিসেস জুন্নারা আপার বহুদিনের পরিশ্রম, মেহনত সবকিছু লাগব হল।কিন্তু সরকারীকরণ হওয়াতে এ বছরই তাঁর চাকুরীর মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।

শিক্ষাক্ষত্রে অর্জন :

শিক্ষাক্ষেত্র বিশেষ অবদানের জন্য জুন্নারা আপা বিভাগীয় ভাবে দুই বার ২০০৫ ও ২০০৯সালে শ্রেষ্ঠ শিক্ষিকা নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

বিদ্যালয়ে চাকুরী করার পর অবসর গ্রহন করেন।তার এ অবসর গ্রহন নিয়মতান্ত্রিকভাবে হলেও এলাকার মানুষ যে তাকে কোন ভাবে ছাড়তে চাচ্ছিল না।কিন্তু তাতেতো আর হবে না।অবসর যে নিতে হল।জুন্নারা আপার এ অবসর গ্রহন বা চলে যাওয়া যে শুধুই যাওয়া নয় একটি আলো ভর্তি পূর্ণিমার চলে যাওয়া।তিনি ছিলেন একজন আত্নপ্রত্যয়ী সৎ ও নিষ্ঠাবান শিক্ষিকা।তেমনি ছিলেন একটি এলাকার শিক্ষাক্ষেত্রের আলোকবর্তিকা ও সফল স্বপ্নদ্রষ্টা। শিক্ষাক্ষেত্রে অফুরন্ত অবদান রাখার জন্য তিনি সিলেট বিভাগের মধ্যে সৃষ্ট শিক্ষিকাও নির্বাচিত হওয়ার গৌরর অর্জন করেন।আমি উনার একজন ছাত্র হিসেবে তাঁর কাছ থেকে যে শিক্ষা পেয়েছি তা আমার সারা জীবনের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করছে এবং করবে।তিনি আমার জন্য একজন আদর্শ মহামানবী।তার কাছ থেকে পাওয়া এ শিক্ষার ঋণ আমি জীবনেও সুধ করতে পারবনা।জুন্নারা আপার মতো আলোকিত মহামানবী পৃথীবিতে একবারই জন্মগ্রহণ করেন পরের কল্যানে নিজেকে উৎসর্গ করার জন্য।জুন্নারা আপার দেয়া শিক্ষাই আজ আমার মতো অনেককে জীবন নামক যোদ্ধে বাঁচতে শেখার অনুপ্ররনা যোগায়।অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে শিখায়।তাইতো জুন্নারা আপার মতো একজন আদর্শময়ী শিক্ষিকা আছেন বলে পৃথীবি হয়তো আজও টিকে আছে। তাইতো কাজী নজরুল যথার্তই বলেছিলে……

উদয়ের পথে শুনি কার বাণী
ভয় নাই অরে ভয় নাই।
নিঃশেষে প্রান যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।

তথ্যসূত্র :জুন্নারা আপা।

বিঃদ্রঃ লিখনির মধ্যে কোন ভুলত্রুটি হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।এ রকম মানুষকে নিয়ে সারা দিন লিখলেও লেখা শেষ হবেনা তবুও চেষ্টা করেছি লেখাটি ভালোভাবে উপস্থাপন করার জন্য। জানিনা তা কতখানি করতে পেরেছি।

Comments

comments

পড়া হয়েছে 583 বার
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত