রাজনগরের বন্যার পানি কমছে-প্রয়োজন প্রচুর ত্রাণের

আহমদউর রহমান ইমরান, রাজনগর (মৌলভীবাজার) থেকে: | ১৯ জুন ২০১৮ | ১০:৩৫ অপরাহ্ন
অ+ অ-

মৌলভীবাজারের রাজনগরে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার উন্নতি হলেও রেখে গেছে ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন। ঈদের দুইদিন আগে (বুধবার) থেকে মনু নদীর পানি বাড়তে থাকলেও কোথাও বাঁধ ভাঙার ভয় ছিল না। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মনু নদীর পানি বেড়ে ঈদের আগের দিন বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধের বেশ কয়েকটি স্থান ভেঙ্গে যায়। এতে প্লাবিত হয়ে উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের ৪২টি গ্রাম ও মনুসরনগর ইউনিয়নের ৩৩টি পুরোপুরি এবং টেংরা ইউনিয়নের ১০টি গ্রামসহ ৮৫টি গ্রাম তলিয়ে যায়। প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্ধি হয়ে পড়ে। গত ৩০ বছরে এমন বন্যা কেউ দেখেনি বলে মত বয়স্ক মানুষদের। পানিবন্ধি মানুষদের উদ্ধারে রাজনগরে ৫০ সদেস্যের সেনাবাহিনীর একটি দল উদ্ধার তৎপরতা চালায়। উদ্ধার তৎপরতা ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারও ব্যবহার করা হয়। বন্যার্তদের আশ্রয়ের জন্য ১৫টিরও বেশিও ফ্লাড সেন্টার খুলা হয়েছে। এদিকে রাজনগরে নগদ ২ লাখ বিশ হাজার টাকা ও ১৬৫ মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে মনসুরনগর ইউনিয়নে নগদ ৯০ হাজার টাকা ও ৭০টন চাল এবং কামারচাক ইউনিয়নে নগদ ১ লাখ টাকা ও ৮৫ টন চাল ও টেংরা ইউনিয়নে ২০ হাজার টাকা ও ১০ টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

গত সোমবার বিকালে মনসুরনগর ইউনিয়নের কদমহাটা এলাকায় দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বন্যাপরিস্থিতি পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণের উদ্বোধন করেন। এসময় তিনি পর্যাপ্ত ত্রাণ ও নগদ টাকা দেয়া হয়েছে বলে বন্যা কবলিত মানুষদের আশ্বস্থ করেন।



এছাড়াও ঈদের দিন থেকে মৌলভীবাজারের সাথে এই উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। কদমহাটা থেকে মহলাল পর্যন্ত দুটি স্থানের প্রায় ২শ ফুটের বেশি রাস্তা ভেঙ্গে গেছে। গতকাল সোমবার বিকালে সেনাবাহিনীর ইনিঞ্জনিয়ারিং টীমের সহায়তায় মৌলভীবাজার-কুলাউড়া সড়কে মেরামত কাজ শুরু হয়েছে। ফলে হাল্কা যান চলাচল শুরু করেছে।

কদমহাটা, মালিকোনা, আশ্রাকাপনসহ বেশ কয়েকটি স্থানে মনু নদীর বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় শুক্রবার রাত থেকে কদমহাটা, শ্বাসমহল, প্রেমনগর আশ্রাকাপন, মহলাল, দক্ষিন মহলাল, মালিকোনা, চাটুরা, বনমালী পঞ্চেশ্বর, পঞ্চেশ্বর, সরখরনগর, খাসপ্রেমনগর, বরকাপনসহ ওই ইউনিয়নের সবকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

কামারচাক ইউনিয়নে মশাজান, কামারচাক, ভোলানগর, দস্তিদারের চক, ইসলামপুর, জালালপুর, তেঘরি, করাইয়া, মৌলভীরচক, আদমপুর, মেলাগড়, শান্তকুল, পঞ্চানন্দপুর, একাসন্তোষ, হাটিকরাইয়া, তেঘরি, চাটিকোনাগাঁও, মুর্তিকোনাসহ ওই ইউনিয়নের পুরো ৪২টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।

এদিকে ছোট ছোট ক্যানেলগুলো দিয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করায় রাজনগর সদর ইউনিয়নের দক্ষিন খারপাড়া এলাকার মুজিবনগর গুচ্চগ্রাম তলিয়ে গেছে।

কদমহাটা উচ্চ বিদ্যালয়, তারাপাশা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, পোর্টিয়াস মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, মহলাল উচ্চ বিদ্যালয়, কামারচাক বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রসহ ১৫ টিরও বেশি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

ধান-চাল, গবাধিপশু নিয়ে মানুষ বেকায়দায় পড়েছেন। নিজেরা আশ্রয় পেলেও গবাধিপশুর থাকার জায়গার ব্যবস্থা করতে পারছেন না। এছাড়া চুরি হওয়ার ভয়ে অনেকে গবাধিপশু রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন।

এদিকে এখন পর্যন্ত এ উপজেলায় ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। ১৬ জুন শনিবার টেংরা ইউনিয়নের সৈয়দনগর গ্রাম থেকে মৃত ইসমাইল উল্লার অসুস্থ স্ত্রী কর্পুল বিবিকে (৮০) স্পিড বোটে করে পানিবন্দী অবস্থা থেকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নেয়ার পর তার মৃত্যু হয়। এরআগে গত ১৩ জুন বুধবার উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের হাটিকরাইয়া গ্রামের মো. মিছবা মিয়ার ছেলে ইমন মিয়া (১০) নিখোঁজ ছিল। পরদিন বৃহস্পতিবার ভাসমান অবস্থায় তার লাশ পাওয়া যায় একটি বাড়ির পাশে।

আশ্রাকাপন এলাকার কাপ্তান মিয়া (৬০) মৌলভীবাজার কুলাউড়া সড়কে ধান শুকাচ্ছিলেন। এসময় তার ছবি তুলতে গেলে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘ ৩০-৩২ মণ ধান ছিল। সব পানিতে ভিজে গেছে। নিজেরা কোনোমতে বেঁচে গেলেও নৌকার অভাবে ধান-চাল ঘর থেকে বের করতে পারিনি।’ এসময় পাশ থেকে তার স্ত্রী বলেন,‘এখন ছবি তুলিয়া কিতা অইতো। আমরা পানিত আছলাম, কেউ দেখাত আইলানা, এখন আইয়া কিতা খরতা’।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌসী আক্তার বলেন, পানি কমার কারনে মানুষজন বিভিন্ন ফ্লাড সেন্টার থেকে বাড়ি ফিরছে। আমরা যে ত্রাণ পেয়েছি তা সুষ্টু ভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বণ্টনই এখন মূল কাজ। এজন্য আমার টেগ অফিসারদের বলে দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সার্বক্ষনিক সমন্বয় করে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

Comments

comments

পড়া হয়েছে 354 বার
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত