মাদক বিরোধী অভিযান; ক্রসফায়ার কিভাবে সমাধান?

এস এইচ সৈকত | ০৪ জুন ২০১৮ | ৭:৫৬ অপরাহ্ণ
অ+ অ-

সিগারেট থেকে নেশা শুরু করলেও মাদকের প্রতি আসক্তি ধীরে ধীরে শুরু হয়। বেশিরভাগই শুরু হয় বন্ধুবান্ধবের সাহচর্যে। মূলত মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে গিয়েই কিশোর-তরুণরা ব্যাপকভাবে নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এ সুযোগে মাদক ব্যবসায়ী, সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্র খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজিসহ নানা কাজে তাদের ব্যবহার করতে থাকে। মাদকের এই নেশার জালে একবার জড়িয়ে পড়লে কেউ আর সহজে বেরিয়ে আসতে পারে না। ফলে মাদকসেবীরা দিনে দিনে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। দেশের সর্বত্র সন্ত্রাসী কার্যক্রম, স্কুল-কলেজগামী মেয়েদের নানাভাবে উত্ত্যক্ত করা, গুলি বা ছুরিকাঘাতে হত্যা কিংবা সড়ক দুর্ঘটনার আধিক্যের পেছনেও মাদকাসক্তির ভূমিকা অন্যতম। মাদকের নেশা এখন আলো ঝলমলনগরীর প্রাণকেন্দ্র থেকে শুরু করে অন্ধকার গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। তাই যত দ্রুত সম্ভব মাদকের এই ভয়ঙ্কর ছুবল থেকে আমাদের দেশকে ও দেশের তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে হবে। কিন্তু বিচারবহির্ভূত ভাবে তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধের মাধ্যমেই কি দেশ থেকে মাদক নিমূল করা সম্ভব?

নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার দেশবাসীকে কিছু ভালো কাজ করে দেখানোর উদ্দেশ্যে এমন উদ্যোগ হাতে নেয় তবে এখনই বিচারবহির্ভূত এমন ক্রসফায়ার বন্ধ করতে হবে। নয়তো এতে সরকারের ভাবমূর্তী চরম পরিমানের ক্ষুণ্য হবে।

ইয়াবা বা মাদক দ্রব্য মূলত আসে পাশ্ববর্তী দেশ ভারত ও মায়ানমার থেকে। এবং বর্ডার পথেই এর আমদানি করা হয়। বর্ডার পথে যদি মাদক দ্রব্রের আমদানি হয়ে থাকে তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর কাজ কি? বর্ডারকে যদি রক্ষা করতে না পারে তবে রাইফেল হাতে নিয়ে কি দিনে রাতে তারা আঙ্গুল চুষে আর মাসে মাসে জনগনের টাকায় বেতন নেয়?

এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার ইয়াবা ব্যাবসায়ী ও সেবনকারীকে পুলিশ এবং র‌্যাবের হাতে আটক হলেও এখনো কোন রাগব বোয়ালদের আটক করতে পারছে না তাঁরা? সারা দেশ যাকে ইয়াবার গডফাদার হিসেবে চেনে আ’লীগের সেই এমপি বদি ও তাই ব্রাতাদের কেনো গ্রেফতার করা হয়নি? ঢাকঢুল পিঠিয়ে যখন বাতি দেশ ছেড়ে চলে গেল তখনো কেউ তাকে বাধা দিল না! মন্ত্রীরা তখন বলেছিলেন, সে মাদকের গডফাদার এমন প্রমাণ তাঁদের হাতে আছে। তাঁকে গ্রেফতার করতে আরও প্রমাণ প্রয়োজন। তাহলে যতটুকু প্রমাণ আছে তা দিয়ে কেনো তাঁকে গ্রেফতার করা হলো না? দেশ ছেড়ে পালানোর সময় কেনো তাকে আটকানো হলো না? কতটুক প্রমাণের ভিত্তিতে শতাধিক লোককে ক্রসফায়ারের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে?

টেকনাফ উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ও তিনবারের পৌর কাউন্সিলর নিহত একরামের স্ত্রী আয়েশা ছিদ্দিকা গত ৩১ মে সংবাদ সম্মেলনে হত্যার সময়কার কিছু অডিও রেকর্ড ফাঁস করেন। ৪ টি অডিও ক্লিপের মোট ১৪ মিনিট ২২ সেকেন্ডে দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে চলা নির্মম হত্যাকান্ডের প্রকৃত চিত্র।

ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে একরাম, তার স্ত্রী সন্তান ও হত্যার সময়কার আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু কথোপকথন। আর এতেই সামাজিক মাধ্যমগুলোতে ঝড় উঠেছে এই নির্মম হত্যার বিরুদ্ধে। আর এতে স্পষ্ট শোনা যায় নিহত একরামের পাশে বুলেট ও পকেটে ইয়াবা রাখার জন্য র‌্যাব সদস্যরা একে অপরকে বলছেন।

পরিস্থিতি সামাল দিতে র‌্যাব বলছে, ফাঁস হওয়া ফোন আলাপের রেকর্ড যাচাই করা হবে। যদি সত্যিই কেউ জড়িত থাকে তবে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নিহতদের মধ্যে আরও একজনের নাম আমজাদ হোসেন। পুলিশ বলছে, তাকে নিয়ে পুলিশ নেত্রোকোনার একটি মাদকের আন্তানায় অভিযান চালায়। এ সময় মাদক ব্যবসায়ীরা পুলিশ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। উভয় পক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময় হলে আমজাদ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। নেত্রকোনা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আশরাফুল আলম বলেন, তার বিরুদ্ধে হত্যা, সহিংসতা ও মাদক সংক্রান্ত ১৪টি মামলা রয়েছে। সম্প্রতি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার করি। পরে তার সহযোগীরা আমাদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। এসময় সে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে।

তবে আমজাদের ভাই মাহিদ আহমেদ আনসারি সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, আমজাদ মাদক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধের কয়েক ঘণ্টা আগে পুলিশ তাদের বাড়িতে অভিযান চালায়। হঠাৎ চালানো এই অভিযানে আমার ভাইকে ব্যাপক মারধর করা হয়। তার বিরুদ্ধে মাদক বিক্রির অভিযোগ পুরোপুরি ভিত্তিহীন। তাকে হত্যা করা হয়েছে শুধু এ কারণে যে, সে বিরোধী দলের (ছাত্রদল) একজন জনপ্রিয় কর্মী ছিল। তিনি বলেন, আমজাদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো এ বছরের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচন উপলক্ষে বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক কর্মীদের উদ্দেশ্যমূলক হয়রানির অংশ।

বন্দুকযুদ্ধের নামে বিচারবহির্ভূত এমন হত্যাকান্ডের ব্যাপারে মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব সুলতানা কামাল বলেছেন, ‘মানুষের জীবন কেড়ে নেয়ার অধিকার কারো নেই।’

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক এ সকল হত্যাকান্ডের  উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘মাদকবিরোধী অভিযানের সময় মানবাধিকারের বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাথায় রাখতে হবে।’ কমিশন বলেছে, ‘বিচারবহির্ভূত কোনো হত্যাকান্ড তারা সমর্থন করেন না।’ মাদক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ‘বন্দুকযুদ্ধে’র মাধ্যমে হত্যাকান্ড  ঘটিয়ে মাদকের ব্যবহার নির্মূল করা সম্ভব নয়।

১৮’শতকের ফরাসি রাজনীতিবিদ ও মানবাধিকার কর্মী ভিক্টর হুগো তার একটি বইয়ে লিখেছিলেন, ‘একজন মানুষকে গিলোটিনের নিচে ফেলে দেওয়ার অর্থ শুধু এই নয় যে শুধু তাকেই হত্যা করা হলো। তার সঙ্গে হত্যা করা হলো তার পরিবারকেও।’ যেসব মাদক বিক্রেতাকে হত্যা করা হচ্ছে, শুধু তাকেই হত্যা করা হচ্ছে না, নিমেষেই ধুলিস্যাৎ করে দেওয়া হচ্ছে একটি পরিবারকেও। এটা কোনো সমাধানের রাস্তা হতে পারে না। হত্যার মধ্যদিয়ে কোনো কিছুকে নির্মূল করা যায় না, বরং তা আরও উসকে ওঠে। সমাজে প্রতিশোধপরায়ণতা বাড়ে।

একটি ক্রসফায়ার মানেই একটি বিচার বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড । আদালত যতক্ষণ পর্যন্ত একজন ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্থ করছে না ততক্ষণ পর্যন্ত সে নির্দোষ। তাহলে কি শুধু পুলিশ ও র‌্যারেব একটি লিষ্টোর মাধ্যমেই এভাবে প্রতি রাতে তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধে একের পর এক বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- ঘটানো হচ্ছে?

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘আমাদের অঙ্গীকার, কর্মসূচি ও ঘোষণা’ শিরোনামের নিচের ‘অগ্রাধিকারের পাঁচটি বিষয়’- এর অন্তর্গত ৫:২ তে- বলা হয়েছে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড বন্ধ করা হবে।’ কিন্তু কোথায় বন্ধ হচ্ছে?

দলের নেতা-কর্মীরা এখন অবশ্যই বলতে পারেন যে, ইশতেহারে ‘বন্ধ করা হবে’ বলা হয়েছে। এখনই বন্ধ করা হবে তা তো বলা হয়নি। তাঁদের যুক্তি হতে পারে ক্রসফায়ারের মাধ্যমে সন্ত্রাসের সমস্যার সমাধান হয়ে গেলে তারপর ক্রসফায়ার বন্ধ করা হবে।

সন্ত্রাসীদের ক্রসফায়ারে মেরে সন্ত্রাস-সমস্যার সমাধান যদি এখন নীতি হয়। তাহলে কোর্ট-কাচারি বন্ধ করে দিয়ে সব হত্যাকারী সন্ত্রাসীদের ক্রসফায়ারে মেরে ফেললেই হয়। অবশ্য অতটা নিশ্চয় সরকার করবে না। কিন্তু নৌপরিবহনমন্ত্রীর বক্তব্য কি সেদিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করছে না বা যদি না হয় অন্তত তাঁর তো পদত্যাগ করা উচিত। অন্য মন্ত্রীরা অবশ্য ইদানীং বলছেন ক্রসফায়ার নেই, অথবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘আত্মরক্ষার্থে’ গুলি ছুড়ে হত্যা করছে। কিন্তু নৌপরিবহনমন্ত্রী রাখঢাক ছাড়া বললেন, “এটাই সমাধান।” নাহ, এটা সমাধান হতে পারে না।

সব ধরনের উগ্র জঙ্গী গোষ্ঠী, ডান-বাম, ধর্ম-অধর্ম হত্যাকেই সমাধান হিসেবে বেছে নিয়ে নির্বিচারে প্রতিপক্ষকে হত্যা করেছে। কিন্তু হত্যা করে কেউ কোনো সমস্যার সমাধান করেছে বলে আমার জানা নেই।

আমাদের ইদানীংকালের উগ্র মৌলবাদী জঙ্গি গোষ্ঠীর দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের ধর্মের অভাবই সব সমস্যার মূল কারণ। বিচারকদের হত্যা সমাধান মনে করে তারা বোমা ফুটিয়ে বিচারকদের হত্যা করেছে, হত্যা সমাধান মনে করেই ২১ আগস্ট বোমা ফাটিয়ে তাদের শত্রু অর্থাৎ আওয়ামী লীগের শীর্ষ প্রায় সব নেতাকে হত্যার প্রায় সফল চেষ্টা করেছে। গান-বাজনা সমস্যা মনে করে রমনার বটমূলে বোমা ফাটিয়ে মানুষ হত্যা করেছে।

হিটলার তাঁর দল ও সশস্ত্র বাহিনী একই ধারণায় উন্মাদ হয়েছিল। তারা ভেবেছিল জার্মানির সব সমস্যার মূল কারণ তাদের ইহুদি জনগোষ্ঠী। অতএব হত্যাযজ্ঞই ছিল সমাধান। আর অপরাধীদের হত্যা করে অপরাধ দমনের চেষ্টা কখনো করেনি এমন সমাজ খুব কমই আছে। কেউ সফল হয়নি। কিন্তু হত্যা অভিযানের একটা ফল বা পরিণতি সব সমাজই ভোগ করেছে। সমাজগুলোতে অপরাধ-নিরপরাধ সবাইকে হত্যা করাটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

লেখকঃ- সাংবাদিক

ইমেইল: soykotpress11@gmail.com

Comments

comments

পড়া হয়েছে 569 বার
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত