নরেন্দ্র মোদির আগমনে আমাদের দিপাক্ষিক সম্পর্ক আরো সুসম্পাদিত হবে

হারুন উর রশীদ :- | ২৫ মার্চ ২০২১ | ৭:৫১ অপরাহ্ণ
অ+ অ-

বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে আসছেন এটি আমাদের বাংলাদেশর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এটা আমাদের জন্য বড় আনন্দের বিষয়। উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী আর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ২৬ মার্চ ঢাকা আসবেন নরেন্দ্র মোদি। মনে করা হচ্ছে, এই সফরে তার সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে সম্মত হওয়া আগের ইস্যুগুলোর অগ্রগতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কথা বলতে পারেন। কেবল মোদি নন, এদেশে একইসময় উপস্থিত হবেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহামেদ সলিহ, শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষে, নেপালের প্রেসিডেন্ট বিদ্যা দেবী ভান্ডারি ও ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং। অন্যদিকে অনুষ্টানে সরাসরি যোগ না দিলেও ভিডিও আকারে বক্তব্য পাঠাবেন আরো কয়েকটি দেশের সরকার প্রধানগন।

নরেন্দ্র মোদি ২৬ মার্চ ঢাকা এসে পরের দিন ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে টুঙ্গিপাড়ায় যাবেন। এরপর সেদিনই মতুয়া সম্প্রদায়ভুক্ত হিন্দুদের পবিত্র তীর্থস্থান কাশিয়ানী উপজেলার শ্রীধাম ওড়াকান্দি গ্রামের ঠাকুরবাড়িতেও তিনি যেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ঠাকুরবাড়িতে অবস্থিত হরি চাঁদ-গুরুচাঁদ ঠাকুরের মন্দিরে তিনি পূজা করে মন্দিরের সামনেই ঠাকুরবাড়ির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলবেন এবং পাশের আরেকটি মাঠে তিন শতাধিক নির্ধারিত মতুয়া নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন বলে জানা গেছে।
তার এই সফর খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্বন্ধের দিগন্ত এখন অনেক প্রসারিত। ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ২০১৫ সালে নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। তবে ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে একাধিক বৈঠকে অংশগ্রহণ করেছেন। ২০১৯ সালের অক্টোবরে দিল্লির হায়দ্রাবাদ হাউসে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। তার আগে ২০১৭ সালের ৭ এপ্রিল থেকে ১০ এপ্রিল ভারত সফর করেন তিনি। এর আগে তিনি ভারত সফরে গিয়েছিলেন ২০১০ সালে। তখন অবশ্য মোদি সরকার ছিল না।



মোদি যখন বাংলাদেশে আসবেন তখন ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ ৬ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শুরু হবে। এই নির্বাচনে ইতোমধ্যে কয়েকটি রাজ্যে তিনি বেশ আগ্রহ নিয়ে নিজের দল বিজেপির পক্ষে প্রচারাভিযানে সংযুক্ত হয়েছেন। তবে তার কাছে বিষয়টি এত দুশ্চিন্তার কারণ হবে না। কারণ ২০১৯ সালের মে মাসে শুরু হওয়া নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় দফার মেয়াদ ২০২৪ সালে শেষ হবে। মনে করা হচ্ছে, তখন তার দেশ ভারত চীনকে টপকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশে পরিণত হবে, আবার এই দেশটি হবে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। আর এ কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক গুরুত্ব বহন করে।

২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর বিশ্বজুড়ে মহামারীর মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক হয় আমাদের প্রধানমন্ত্রীর। দুই দেশের সম্পর্ককে ঐতিহাসিক হিসেবে অভিহিত করে সে সময় শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘আগামী বছর বাংলাদেশ ৫০ বছরে পা দিতে যাচ্ছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ-ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কও ৫০ বছরে পড়ছে।’ তার মতে, উভয় দেশ বিদ্যমান সহযোগিতামূলক ঐকমত্যের সুযোগ নিয়ে অর্থনীতিকে বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিকভাবে আরো সংহত করতে পারে। দুই দেশের চলমান উদ্যোগগুলো এতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে।’ কোভিড-১৯

মোকাবিলায় ভারতের স্বাস্থ্য প্যাকেজের পাশাপাশি ‘আত্মনির্ভর ভারত’ উদ্যোগের বিভিন্ন প্যাকেজের প্রশংসা করে তিনি আরো বলেন, ভারতের গৃহীত নীতিমালার মাধ্যমে দেশটি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ১৯৭১ সালে এদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য যোগসূত্র স্মরণে বিশ্বের বিভিন্ন শহরে ২০২১ সালে বছর জুড়ে যৌথ কর্মসূচি পালনে বাংলাদেশ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘২০২১ সালের ২৬ মার্চ ঢাকায় আপনার উপস্থিতি আমাদের যৌথ উদ্যাপনের গৌরবময় স্মৃতি স্মরণীয় করে রাখবে।’ওই ভার্চুয়াল বৈঠকে ৫৫ বছর পর বাংলাদেশের চিলাহাটি ও ভারতের হলদিবাড়ির মধ্যে রেল করিডরেরও সুইচ টিপে উদ্বোধন করেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় ওই রেলপথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল।

এছাড়াও ইতিমধ্যে ভারতের বদরপুর, করিমগঞ্জের সাথে সংযুক্ত কুলাউড়া শাহবাজপুর রেললাইন পূনরায় চালুর লক্ষ্য ২০১৮ সালের মাঝা-মাঝি সময়ে উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্স এর মাধ্যমে শুভ উদ্বোধন করেন। যা এই কাজের দায়িত্ব পায় ভারতীয় রেল নির্মান প্রতিষ্ঠান কালিন্দী কোম্পানি। ইতিমধ্যে সেই রেলপথের কাজ প্রায় ৫০ ভাগ সমাপ্তের পথে।

এছাড়া ভার্চুয়াল বৈঠকে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ভারতের পোস্টার ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর ওপর একটি স্মারক ডাকটিকেট যৌথভাবে উদ্বোধন করেন। একইসঙ্গে বঙ্গবন্ধু-বাপু (মহাত্মা গান্ধী) ডিজিটাল এক্সিবিশনও উদ্বোধন করেন দুই দেশের এই দুই সরকারপ্রধান। এছাড়া দুই নেতার ওপর একটি ছোট্ট প্রমোও দেখানো হয়। ২০২০ সালে মহামারীর মধ্যেও দুই দেশের সহযোগিতা অব্যাহত থাকার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা তখন বলেছিলেন, বছর জুড়ে রেলরুট দিয়ে বাণিজ্য, উচ্চপর্যায়ের পরিদর্শন ও সভা, সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ, কলকাতা থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতে ভারতীয় পণ্যসামগ্রীর প্রথম পরীক্ষামূলক চালান প্রেরণ এবং অবশ্যই কোভিড-১৯ বিষয়ে সহযোগিতার ন্যায় বিভিন্ন উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করেছি।

তিনি বলেন, করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলা করতে ব্যাপক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন ব্যাপক বিঘ্ন ঘটা এবং ভোক্তাদের চাহিদা হ্রাস পাওয়া সত্ত্বেও আমাদের অর্থনীতি উর্ধমুখী প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে। বেশ কিছুসংখ্যক ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশের উৎপাদন ও সেবা খাতে নিযুক্ত রয়েছেন এবং তারা নিজ দেশ ভারতে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে থাকেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যক পর্যটক এবং চিকিৎসা সেবা গ্রহণকারীকে ভারত গ্রহণ করে।
বলাবাহুল্য, মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের আন্তরিক সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য দেশটির সরকার এবং ভারতের জনগণের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানানো আমাদের সবসময় দায়িত্ব। তবে ২০২০ ও ২০২১ সাল মহামারীর জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, তবে এর মধ্যেও ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ভালো সহযোগিতামূলক লেনদেন গড়ে উঠেছে। ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতা আছে। নানা ক্ষেত্রে দুই দেশের অংশীদারিত্ব এগিয়ে যাচ্ছে। স্থল সীমান্ত বাণিজ্যে সমস্যা কমানো গেছে, কানেক্টিভিটি অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নতুন নতুন জিনিস যোগ হয়েছে। এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, দু’দেশের সম্পর্ক আরো দৃঢ় হয়েছে।

২০২০ সালের ২৫ মার্চ করোনা মোকাবিলায় চীনের আগে এদেশে এসেছে ভারতের জরুরি চিকিৎসা সহায়তা সরঞ্জাম। ৩০ হাজার সার্জিক্যাল মাস্ক এবং ১৫ হাজার হেড কভার ছিল আমাদের জন্য মূল্যবান। এছাড়াও করোনার ভ্যাক্সিন (টিকা) ও। এই উপহার ছিল করোনা ভাইরাস বিস্তার রোধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ। ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথমে’ নীতির অংশ হিসেবে এবং কোভিড-১৯ এর বিস্তার রোধ করার জন্য একটি সমন্বিত আঞ্চলিক উদ্যোগ নিতে ১৫ মার্চ ২০২০ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং অন্য সার্ক নেতৃবৃন্দ একটি ভিডিও সম্মেলন করেন। এই অঞ্চলের প্রতি ভারতের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এটি। এই উপহারের মতো ভ্যাকসিনও উপহার পেয়েছি আমরা। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার আবিষ্কৃত কোভিশিল্ড নামের টিকা তৈরি করেছে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট। সেই কোভিশিল্ড নামের ভ্যাকসিন ২১ জানুয়ারি (২০২১) ভারতের উপহার হিসেবে ঢাকায় এসে পৌঁছায়। আগেই ভারত জানিয়েছিল, কুড়ি লাখ ডোজ টিকা বিনামূল্যে বাংলাদেশকে উপহার দেবে তারা। এই উপহার দু’দেশের একসঙ্গে সংকট মোকাবিলার অনন্য নজির। মনে রাখতে হবে, ২০০৯ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতবিরোধী সন্ত্রাসীদের কঠোর হস্তে দমন করে সুনাম কুড়িয়েছেন।

২০১৫ সালে নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের আগে সীমান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য সংবিধান সংশোধনী বিল পেশ এবং ৬ মে রাজ্যসভায় তা পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। একাত্তরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক যে উচ্চতায় উঠেছিল, ওই বিল পাস হওয়ায় সেই সম্পর্ক আবার সেই উচ্চতায় পৌঁছায়। রচিত হয় সহযোগিতা ও বন্ধুতার এক নতুন সংজ্ঞা। সেসময় ছিটমহলের বাসিন্দারা উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। এতদিন পর্যন্ত ছিটমহলবাসীদের কোনো রাষ্ট্র ছিল না; এখন স্থলসীমান্ত নির্দিষ্ট হলে নিজেদের পরিচয় বিকশিত হয়েছে। আর বিলটি পাস হওয়ায় ১৯৭৪ সালের বঙ্গবন্ধু-ইন্দিরা গান্ধী চুক্তি বাস্তবায়নের সকল বাধা দূর হয়। উল্লেখ্য, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দায়িত্ব গ্রহণ করেই প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি একাধিকবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এ ব্যাপারে আশ্বাসও দেন। একই আশ্বাস দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এখন ভারতের বিশিষ্টজনরা এককথায় স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশ ভারতের সবচেয়ে বড় বন্ধু। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের সবচেয়ে বড় মঙ্গলাকাক্সক্ষী।

অন্যদিকে ‘ভারত প্রতিবেশীকে ছাড় দেয় না’- এটা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে আয়োজিত দ্বিপাক্ষিকভিত্তিক চুক্তি অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। দুই পক্ষ লাভবান হচ্ছে সমঝোতা স্মারকে। শেখ হাসিনার প্রচেষ্টায় দুই দেশের অনেক দিনের সমস্যাগুলো সমাধান হয়েছে এবং নরেন্দ্র মোদির সফরের মধ্য দিয়ে উভয় দেশের সুসম্পর্ক আরো গভীর হতে যাচ্ছে। আর এ জন্যই ২৬ মার্চ (২০২১) নরেন্দ্র মোদির এদেশ সফর গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

লেখক : অবসর প্রাপ্ত সরকারী চাকুরীজীবী

Comments

comments

পড়া হয়েছে 275 বার
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
x