যাত্রীদের জনদূর্ভোগ

দীর্ঘ ৯বছর থেকে কুলাউড়ার গুরুত্বপূর্ণ ৪টি রেল স্টেশন বন্ধ

জসিম চৌধুরী,সংবাদমেইল২৪.কম | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৪:০৯ অপরাহ্ন
অ+ অ-

কুলাউড়া উপজেলায় গুরুত্বপূর্ণ ৪টি রেলস্টেশন লোকবল সংকটের কারণে প্রায় ৯ বছর থেকে পুরোদমে বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন থেকে এসব স্টেশনগুলো বন্ধ থাকায় স্থানীয় যাত্রী ও মালামাল পরিবহনে চরম দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে স্থানীয়দের।

রেলওয়ে এবং স্থানীয় এলাকা সূত্রে জানা যায়, লোকবলের অভাবে আখাউড়া-সিলেট রেললাইনের কুলাউড়া উপজেলার টিলাগাঁও, ভাটেরা, মনু ও ছকাপন স্টেশনের কার্যক্রম একবারেই বন্ধ হয়ে পড়ে। এরমধ্যে ২০০৯ সালে ভাটেরা ও টিলাগাঁও স্টেশন রেল কর্তৃপক্ষ ওয়ানওয়ে লাইন চালু রেখে স্টেশন বন্ধ ঘোষণা করে। এছাড়া ছকাপন ও মনু স্টেশনে টিকেট কার্যক্রম আগে চালু থাকলেও গত ৩বছর থেকে সেই কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে গেছে।



এসব স্টেশনে যাত্রাবিরতি দিয়ে লোকাল মেইল, জালালাবাদ, কুশিয়ারা ও কমিউটর (ডেমু) ৪টি ট্রেন নিয়মিত চলাচল করে। উপজেলার মনু স্টেশনে হাজীপুর, পাশবর্তী শরীফপুর, পতনউষা, টেংরা, রহিমপুর, কামারচাক ইউনিয়ন, টিলাগাঁও স্টেশনে টিলাগাঁও ও পৃথিমপাশা ইউনিয়ন, ছকাপন স্টেশনে ভূকশিমইল, কাদিপুর ইউনিয়ন এবং ভাটেরা স্টেশনে ভাটেরা ইউনিয়নের কয়েক শতাধিক সাধারণ যাত্রী মালামাল নিয়ে প্রতিদিন এসব ট্রেনে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত করেন।

এক সময় কুলাউড়ার বিভিন্ন চা-বাগানের চা-পাতা, সাপ্তাহিক নিলাম বাজারে উঠানোর জন্য জালালাবাদ ট্রেনে চট্টগ্রামে পাঠানো হত। এছাড়াও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন স্থান থেকে পণ্য আমদানি-রপ্তানি করতে ট্রেন যোগে এসব স্টেশন ব্যবহার করতো। কিন্তুু স্টেশনগুলো বন্ধ হওয়ায় যাত্রী ও ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত দূর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। স্টেশনগুলো বন্ধ থাকায় এসব লোকাল ট্রেন স্টেশনে থামলেও মাত্র ৩০ সেকেন্ড থেকে ১ মিনিটের মধ্যে হুইসেল দিয়ে ছেড়ে যায়। এতে যাত্রী উঠানামা এবং মালামাল পরিবহনে পড়তে হয় নানা বিড়ম্বনায়। অনেক সময় তাড়াহুড়োর কারণে বড় দূর্ঘটনার শিকার হন যাত্রীরা। সরেজমিন এসব স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, ৪টি স্টেশনই তালাবদ্ধ। যাত্রী জনসাধারনের নেই কোন আনাগোনা। ট্রেনের নির্ধারিত সময় অনুমান করে কয়েকজন যাত্রী লোকাল ট্রেনের অপেক্ষা করলেও তাদের জানা নেই কখনো আসবে সেই ট্রেন।

ভাটেরা স্টেশনের লোকাল ট্রেনের জন্য অপেক্ষামান রত যাত্রী পাবেল আহমদ,তুহিন আহমদ,আব্দুল আল মামুন,কামরুজ্জামান খাঁন, ছকাপন স্টেশনের মহিলা যাত্রী আছিয়া বেগম,রিপা বেগম ও ছাত্র শাহরিয়ার সামাদ,শরিফ আহমদ,জসীম উদ্দিন, টিলাগাঁও স্টেশনের যাত্রী রাকেশ চন্দ্র পাল,সেলিম মিয়া, আলী হোসেন, ইউপি সদস্য দেওয়ান চান্দ আলী, মনু স্টেশনের যাত্রী জায়েদ আহমদ, রেিবজ সিদ্দিকী, সাইফুল আলম সাহান, নাজিরা বেগম,আছিয়া খাতুন ও পিয়ারা বেগম জানান, একসময় এসব স্টেশনে এসে ট্রেনের সময়সূচী ও টিকেট পাওয়া যেত। কিন্তুু দীর্ঘদিন থেকে স্টেশনগুলো বন্ধ থাকায় আমরা ট্রেন যাতায়াতে নানা অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছি। স্টেশনে টিকেট বিক্রির কোন কার্যক্রম না থাকায় ট্রেনে উঠে সিলেট এবং অন্যান্য স্টেশনে পৌছার পর স্থানীয় টিকেট চেকিংয়ের সময় আমাদেরকে পড়তে হয় নানা বিপাকে। অনেক সময় দন্ড হিসেবে দিগুণ টাকা দিয়ে তাদের কাছ থেকে ছুটে আসতে হয়।

 

 

 

 

 

 

এসব স্টেশনগুলো চালুর দাবিতে বিভিন্ন সময় একাধিকবার আন্দোলন, ট্রেন থামিয়ে অবরোধ এবং রেল কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসক বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান করে প্রতিবাদ জানিয়েছিলো স্থানীয়রা। কিন্তুু আজও অবধি সেই দাবি পূরণ হয়নি তাদের। এতদ অঞ্চলের সাধারণ যাত্রীরা এসব স্টেশনগুলো পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে গত ১০ সেপ্টেম্বর কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেললাইন সংস্কার পুনবার্সন কাজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে রেলওয়ে মহাপরিচালক মোঃ আমজাদ হোসেনের মাধ্যমে রেলমন্ত্রী বরাবরে কুলাউড়ার ৪টি বন্ধ স্টেশন চালু ও কুলাউড়ায় আন্তঃনগর ট্রেনের আসন সংখ্যা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবি নিয়ে একটি স্মারক লিপি প্রদান করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ভিত্তিক সংগঠন কুলাউড়ার সমস্যা ও সম্ভাবনা গ্রুপ।

ভাটেরা ইউপি চেয়ারম্যান সৈয়দ এ কে এম নজরুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ ০৯ বছর থেকে ভাটেরা স্টেশন বন্ধ থাকায় এই ইউনিয়নের যাত্রী এবং ব্যবসায়ীরা চরম দূর্ভোগে শিকার। ট্রেনযোগে সিলেট যাতায়াতের ক্ষেত্রে এই স্টেশনটি আমাদের অন্যতম বাহন ছিলো। স্টেশনটি সচল রাখার দাবিতে শ্রম মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মিকাঈল সিপার ও পাশ্ববর্তী সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদুস সামাদ চৌধুরী কয়েছের ডিও লেটার নিয়ে রেল সচিবের কাছে প্রদান করি। কিন্তুু আজও অবধি সেই দাবি বাস্তবায়ন হয়নি। অচিরেই স্টেশনটি চালুর জন্য ইউনিয়নবাসীর পক্ষ থেকে জোর দাবি জানাচ্ছি।

টিলাগাও ইউপি আব্দুল মালিক বলেন,প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাবে দীর্ঘ ০৯ বছর থেকে টিলাগাঁও রেল স্টেশন বন্ধ রয়েছে। ব্রিটিশ শাসনামলে ডানকান ব্রাদার্সের বাগান ও এলাকার জনসাধারণের সুবিধার্থে টিলাগাঁও ষ্টেশন স্থাপন করা হয়েছিল। বি-গ্রেডের স্টেশন টিলাগাঁওয়ে শুধু বাগানের মালামাল বুকিং করেই সরকারের লক্ষ লক্ষ টাকা রাজস্ব আয় হতো। চা-বাগান বেস্টিত রেল স্টেশনটি অনেক গুরুত্বপূর্ন হলেও বর্তমানে এ স্টেশন অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে যাত্রীরা চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। অপরদিকে সরকার লক্ষ লক্ষ টাকার রাজস্বখাত থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

হাজিপুর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল বাছিত বাচ্চু বলেন, শতাব্দীর প্রাচীন মনু স্টেশন দিয়ে হাজিপুর, পাশবর্তী শরীফপুর, পতনউষা, টেংরা, রহিমপুর, কামারচাক ইউনিয়নের মানুষজন ট্রেন দিয়ে যাতায়াত করতেন। পাশাপাশি মনু স্টেশনের মাধ্যমে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও চাঁদপুর থেকে ইলিশসহ পণ্য সামগ্রী এসে মনু নদী দিয়ে নৌপথে জেলার বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হতো। ট্রেন যাত্রায় পণ্য পরিবহন এবং জনসাধারণের চলাচল একদিকে যেমন খরচ কম তেমনি আরামদায়ক। কিন্তুু গত ৩বছর যাবৎ এই স্টেশনটি বন্ধ থাকায় আমরা এলাকাবাসী নিয়ে গতবছর অবরোধ ও মানববন্ধন কর্মসূচী করি। কিন্তুু উদ্ধর্তন কর্তৃপক্ষের অনেক আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। একদিকে যেমন জনগণের ভোগান্তি হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

কুলাউড়া রেলওয়ে জংশন স্টেশন মাস্টার মোঃ মফিজুল ইসলাম জানান, আমি এখানে এসেছি প্রায় বছর খানেক হলো। বন্ধ স্টেশনগুলো মূলত স্টেশন মাস্টার ও পয়েন্ট ম্যানের অভাবে বন্ধ রয়েছে। আশা করছি উদ্বর্তন কর্তৃপক্ষ মাস্টার ও পয়েন্ট ম্যান নিয়োগ দিয়ে স্টেশনগুলোর কার্যক্রম আবার চালু করতে পারে।

Comments

comments

পড়া হয়েছে 665 বার
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত